নিজস্ব প্রতিবেদক
আর্থিক দৈন্যতা, মাটির মূল্য বৃদ্ধির ফলে চাঁদপুরে মৃৎশিল্পীরা ধীরে ধীরে এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আর সেই সাথে বিলুপ্তির পথে এ মৃৎশিল্প। এ ব্যাপারে মৃৎশিল্পীদের অভিমত, তাদের তৈরিকৃত মালামালও বিকিকিনি হচ্ছে একেবারে কম। তাই হতাশ বছরের পর বছর ধরে মৃৎ শিল্পের সাথে জড়িত এ পেশার মানুষগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটা সময় ছিলো যখন মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের হাড়ি-পাতিল ও খেলনার খুব কদর থাকলেও আধুনিকতার কাছে বিপন্ন প্রায় এ মৃৎশিল্প। যারা বংশ পরম্পরায় এ পেশা ধরে রেখেছেন তাদের জীবন চলছে অতি কষ্টে। তাদের তৈরিকৃত মালামাল বিক্রি করতে না পেরে জীবন যাত্রায় অভাব-অনটন লেগেই আছে। যে কারণে তাদের সন্তানদেরও পড়াশুনো করাতে পারছেন না। নানা প্রতিকূলতার কারণে অনেকে বাপ-দাদার এই পেশাও পাল্টাতে পারছেন না।
জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মৃৎশিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্লাষ্টিক সামগ্রীর সহজ প্রাপ্রতার কারণে আজ এই শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। শত কষ্টের মধ্যেও যে ক’টি পরিবার টিকে রয়েছে তা কেবল বাপ-দাদার পেশা কিংবা অন্য কাজ করে এ সমস্ত মৃৎশিল্পিরা অভ্যস্ত নয় বলেই এ পেশা ধরে রেখেছে।
চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল এলাকার ডাকাতিয়া নদীর পাশের বাড়ির সহায় সম্বলহীন মৃৎশিল্পি পরেশ পাল জানান, আমরা বংশ পরস্পরায় এ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। কিন্তু বর্তমানে মাটির তৈরির সামগ্রীর আর তেমন চাহিদা নাই। তবে বৈশাখী মেলায় কিছু খেলনা সামগ্রী বিক্রি হয় তাই খেলনা বানাই। এছাড়া সারা বছর ফুলের টব আর কিছু দধির পাতিল বেইচা কোনোরূপ খেয়েপরে বেঁচে আছি।
হাজীগঞ্জ উপজেলার ৭নং পশ্চিম বড়কুল ইউনিয়নের নাটেহরা গ্রামের পাল বাড়ির প্রায় ১৮টি পরিবার বংশানুক্রমে যুগ যুগ ধরে এ পেশা ধরে রেখেছেন। এ ব্যাপারে কথা হয় তাদের অনেকের সঙ্গে। তাদের মধ্যে জগেশ্বর পাল, হারাধন পাল ও নিরন্দ্র পাল জানান, এ এলাকার আশেপাশে বেশ ক’টি ইটের ভাটা রয়েছে। ইট বানাতে তারাই বেশি দামে প্রচুর পরিমাণ মাটি কেটে নিচ্ছে। জমির মালিকরাও ইট ভাটায় অধিক দামে মাটি বিক্রয় করায় মৃৎ শিল্পের সাথে জড়িত পরিবারগুলো পাল্লা দিয়ে মাটি কিনতে পারছে না।
এ ব্যাপারে মৃৎশিল্পি কাঞ্চনবালার সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন আর মানুষরা মাটির তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার করে না বললেই চলে। প্লাস্টিক আর অ্যালমুনিয়ামের জিনিসের দাম কম ও সহজলভ্য হওয়ায় মাটির জিনিস কেউ কিনতে চায় না।
হাজীগঞ্জ বাজারের মৃৎশিল্পী ও মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রেতা হারাধন পাল জানান, আসলে আমাদের বাপ-দাদারা কইরা গেছে বলেই এখনো এ ব্যবসা ধইরা রাখছি। তবে এখন ওসব মালামালের সাথে এখন প্লাস্টিক ও অ্যালমুনিয়ামের মালামালও বিক্রি করছি। তারপরেও যা কিছু মাটি ক্রয় করে বিভিন্ন হাড়ি-পাতিল, খেলনাসহ বিভিন্ন শো-পিচ মালামাল তৈরি করছে। এসব মালামাল বেচাবিক্রি ভালো না হওয়ায় আর্থিকভাবে পিছয়ে পড়ছে চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকার পরিবারসহ ব্যবসায়ীরা।
‘চাঁদপুরে কতটি পরিবার এ পেশার সাথে জড়িত তা তাদের জানা নেই’ বলে জানান বাংলাদেশ ুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) চাঁদপুর শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবদুল লতিফ। তিনি বলেন, মাটি তৈরি মালামালের ধরণ পাল্টানো প্রয়োজন আর এর জন্যে প্রয়োজন প্রশিণ ও আর্থিক সহায়তার। সম্প্রতি আমরা জরিপ করে জেনে নেবো কতটি পরিবার এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। হাজার বছরের এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হবে, এমনটাই প্রত্যাশা করছে বিপন্ন প্রায় এ শিল্পের কারিগররা।
শিরোনাম:
বুধবার , ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ , ১৬ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।

