১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে চাঁদপুরবাসী প্রস্তুত

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগি্ন স্থানে শুচি হোক ধরা।’ প্রকৃতির নিয়মে দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এলো বাংলা সন ১৪২৫। বসন্ত শেষে প্রকৃতিতে ছোঁয়া লেগেছে গ্রীষ্মের। ঝাঁজালো রোদও তাই জানান দিচ্ছে। কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে আরো একটি বছর। রাত পোহালেই নতুন বছর ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সবাই। মানুষ ভালো থাকুক আর মন্দ থাকুক নববর্ষ ভালোভাবে কাটুক_এটাই সবার প্রত্যাশা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দেশের সর্বত্র আগামীকাল ১৪ এপ্রিল রোববার ১৪২৬ বাংলা সনের প্রথমদিন পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হবে মহাআনন্দে সাড়ম্বরে। তবে ব্যতিক্রম দেখা যাবে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে। তারা বৈশাখের দ্বিতীয়দিন সোমবার হালখাতা অনুষ্ঠান করবে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।

সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুর জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলা শহর, গ্রাম আর শহরতলীর মানুষ বৈশাখ উদ্যাপনে উদ্গ্রীব হয়ে আছে। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কীভাবে বরণ করবে পহেলা বৈশাখকে। তাই চারদিকে ব্যাপক আয়োজন। বাঙালিয়ানা আর ঐতিহ্যের আহ্বান থেকে চিরচেনা বৈশাখকে কীভাবে বরণ করবে, তার পরিকল্পনাও নিয়ে রেখেছেন অনেকে।

উৎসবপ্রিয় বাঙালি তথা চাঁদপুরের আপামর জনতা এবং বিভিন্ন সংগঠন নববর্ষের বর্ণাঢ্য উচ্ছ্বাসময় উৎসবের জন্যে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুত নিয়ে রেখেছে। দোকান/গদিঘর, মিল-ফ্যাক্টরী ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিচ্ছে। অতীতের গ্লানি মুছে দিয়ে নতুন প্রভাতে নতুন মনে আবার ফুটে উঠুক সকলের মুখে আনন্দের হাসি- এমনটা কামনা করে পুরাতন হিসাব চুকিয়ে শুভ হালখাতা করা নিয়ে ব্যস্ত সকল স্তরের ব্যবসায়ী। মিষ্টি দোকানিরা ব্যস্ত জিলাপি, দই-মিষ্টি বানানোর কাজে। খই-মুড়ির পাইকারি ও খুচরা বাজারও সরগরম। পোশাক ও কসমেটিকস্ এবং শাড়ি-লুঙ্গির দোকানগুলোর বেচা বিক্রি নববর্ষ উপলক্ষে বেড়েছে। শহরে বিভিন্ন মার্কেটে চলছে নববর্ষের কেনাকাটা। পহেলা বৈশাখে নারীদের কাছে নতুন ডিজাইনের শাড়ি এবং পুরুষদের পছন্দ উৎসবের পাঞ্জাবি-পায়জামা ও ফতুয়া। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তারা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন মহাজনরা খুশি মনে তাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের পাঞ্জাবি-লুঙ্গি, গামছা এমনকি বউয়ের জন্য শাড়িও উপহার হিসেবে দিয়ে থাকেন। নববর্ষের দিনটিতে সবাই ভালো থাকতে চেষ্টা করেন। এই উৎসবকে ঘিরে পাড়া-মহল্লার ছেলে-মেয়েরা আনন্দে মেতে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলাও বসে।

একসময় পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পান্তা ইলিশ খাওয়ার খুব রেওয়াজ থাকলেও গত বেশ কবছর সেই রেওয়াজ নেই। জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় বছরের এ সময় নদীতে মাছ ধরা (বিশেষ করে ইলিশ) নিষেধ থাকায় এখন আর শহরে পহেলা বৈশাখের ইলিশ পান্তা খাওয়া হচ্ছে না। তারপরও কোনো কোনো ব্যবসায়ী ১লা বৈশাখকে সামনে রেখে বার্মার ইলিশ আমদানিসহ কিছু দেশী ইলিশ মজুদ রেখেছেন হয়তো আগামীকাল মহাআনন্দে ভোজনরসিকদের পান্তা ইলিশ উদ্যাপনের সুবিধার্থে।

বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং চাঁদপুর পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক বছরের ন্যায় এবারো চাঁদপুর প্রেসক্লাব সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠিত হবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মূল কর্মসূচি। এর আগে সকাল ৯টায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হবে চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে। শোভাযাত্রাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রেসক্লাব সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে উন্মুক্ত তীর ভূমিতে অনুষ্ঠানস্থলে এসে শেষ হবে। এখানে সকাল ১০টায় লোকজ মেলার উদ্বোধন করা হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হবে পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়াসহ দেশীয় গান ও নৃত্যের অনুষ্ঠান। এছাড়া বড়স্টেশন মোলহেড চত্বরে দেশীয় সংগীতানুষ্ঠান এবং মোলহেড সংলগ্ন বালুরমাঠে প্রীতি হা-ডু-ডু প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মোলহেড চত্বরে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ ও দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং সুবিধাজনক সময়ে হাসপাতাল, কারাগার ও সরকারি শিশু পরিবারে উন্নতমানের খাবারের আয়োজন এবং জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এ বছর নববর্ষ উদ্যাপনে সকল ধরনের আনন্দ উৎসবসহ আয়োজন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। আজ নৃত্যাঙ্গনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে ১৪২৫ বর্ষবিদায় ও ১৪২৬ বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

এদিকে জেলা প্রশাসন ছাড়াও চাঁদপুর প্রেসক্লাব, সংগীত নিকেতন, চাঁদপুর সরকারি কলেজ, চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ, পুরাণবাজার কলেজসহ বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্নের পথে।

বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় ২ বৈশাখ সোমবার অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উদ্যাপিত হবে হালখাতা অনুষ্ঠান। কোনো কোনো বাংলা পঞ্জিকা মতে ১৪২৬ বাংলা সনের প্রথমদিন সোমবারই হলো পহেলা বৈশাখ। সেই মতে অনেকেই এ দিনটি বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করবে। বিশেষ করে হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষজনের কাছে ২ বৈশাখ এ দিনটি বাংলা বছরের ১ম দিন হিসেবে বিবেচিত হবে।