সড়কে থামেনি মৃত্যুর মিছিল : একদিনেই নিহত ১২

সখীপুরে উত্ত্যক্ত করতে গিয়ে স্কুলছাত্রীর প্রাণ নিল পিকআপ চালক * ধামরাইয়ে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের মধ্যেই রাজধানীসহ আট জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুক্রবার রাতে ঢাকার ধামরাইয়ে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। বেলা দেড়টার দিকে ঢাকার মগবাজারে বাসের চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।

টাঙ্গাইলের সখীপুরে পিকআপের ধাক্কায় দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী নিহত হন। এ সময় ওই পিকআপের ১২ বছর বয়সী চালক মেয়েটিকে ইভটিজিং করছিল। তাকে উত্ত্যক্ত করতে গিয়েই সে তার গায়ে গাড়ি তুলে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে দ্বিতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রী সিএনজি অটোরিকশা চাপায় নিহত হয়।

এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, শেরপুর, নাটোর ও নারায়ণগঞ্জে অন্যরা নিহত হয়েছেন। যুগান্তর রিপোর্ট ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সাভার : প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত পৌনে ৮টার দিকে প্রায় ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে সূর্যমুখী নামের একটি যাত্রীবাহী বাস আরিচার দিকে যাচ্ছিল। বাসটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জয়পুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা সেতু পরিবহনের ৪৫ জন যাত্রী বোঝাই অপর একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

এতে ঘটনাস্থলেই দুই যানবাহনের চারজন মারা যান। এ ছাড়াও দুই বাসের আরও প্রায় ৩৫ জন যাত্রী আহত হন। তাদের উদ্ধার করে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে দু’জনের নাম জানা গেছে, তারা হলেন- তপন মিয়া (৩০) ও মামুন মিয়া। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ অন্যদের পরিচয় জানাতে পারেনি।

ধামরাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জুলফিকার হায়দার দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ধামরাই ফায়ার সার্ভিসের ওয়ার হাউজ ইন্সপেক্টর সাহেব আলী যুগান্তরকে বলেন, ধামরাই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায়। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি সড়ক থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

ধামরাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জুলফিকার হায়দার বলেন, বাস দুটি আটক করা হয়েছে। তবে চালক ও হেলপারের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সখীপুর (টাঙ্গাইল) : শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে সখীপুর-সাগরদিঘি সড়কে উপজেলার বড়চওনা গ্রামের বেলতলী বাজারের পাশে একটি পিকআপ (ঢাকা মেট্রো-ন-১১-৮৯৪২) এসএসসি পরীক্ষার্থী সাদিয়া আক্তারকে ধাক্কা দেয়। স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে অবস্থার অবনতি হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কালিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বড়চওনা উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি লালমিয়া বলেন, সে আমার স্কুলের ছাত্রী ছিল। একটি অল্প বয়সী ছেলে পিকআপ চালাচ্ছিল। সে মেয়েটিকে ইভটিজিং করতে গিয়ে তার গায়ে গাড়ি তুলে দেয়।

উপজেলা বাস, কোচ ও মিনিবাস শ্রমিক সমিতির সভাপতি আবদুল হালিম সরকার লাল বলেন, এটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়। ১২-১৩ বছরের একজন চালকের সহকারী পিকআপ চালানোর নামে তার বন্ধুদের নিয়ে ইভটিজিং করতে গিয়ে মেয়েটিকে হত্যা করেছে।

এদিকে সাদিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তার সহপাঠীসহ শত শত শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা। তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। নিহত সাদিয়া বড়চওনা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। সে বড়চওনা ধলীপাড়া গ্রামের আজাহারুল ইসলামের মেয়ে।

সখীপুর থানার ওসি এসএম তুহীন আলী জানান, পিকআপটি আটক করা হয়েছে। মামলার প্রস্তুতি চলছে। ঘাতক চালককেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ) : শ্রীনগরে সিএনজি চাপায় এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা-দোহার সড়কের উপজেলার দামলা এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় স্কুলছাত্রী আরিফা আক্তারকে (৯) বেপরোয়া গতির একটি সিএনজি চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

আরিফা দামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। সে দামলা গ্রামের খান বাড়ির মো. মনির হোসেনের মেয়ে।

এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এলাকাবাসী ঘাতক সিএনজি আটক করে ও চালককে গণধোলাই দেয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : মহাসড়ক নয় শহরের গলি রাস্তায় অটোরিকশার ধাক্কায় নিহত হয়েছে চার বছরের এক শিশু। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শিশু সানজিদ শহরের হরিমোহন গাবতলা এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় একটি অটোরিকশা তাকে ধাক্কা দেয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত সানজিদ পৌর এলাকার স্কুল-কলেজ রোড মহল্লার তহুরুল ইসলামের ছেলে।

সিরাজগঞ্জ : রায়গঞ্জ উপজেলায় ট্রাকের চাপায় বেলাল হোসেন (৫৮) নামে এক ভ্যানচালক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার সকালে হাটিকুমরুল-বগুড়া মহাসড়কের ভূইয়াগাঁতী কামারপাড়া ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত বেলাল উপজেলার ঘুড়কা বাজার এলাকার বাসিন্দা।

শেরপুর ও শ্রীবরদী : শ্রীবরদীর কিয়ামতলী এলাকায় বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে মোটরসাইকেল ও ট্রলির মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ট্রলি চালক ও অপর দুই মোটরসাইকেল আরোহী আহত হয়েছে। নিহতের নাম রবিউল ইসলাম (২৫)। তিনি নয়ানী শ্রীবরদী গ্রামের মিস্টার আলীর ছেলে।

আহত দুই মোটরসাইকেল আরোহী শিশু দিনা (১০) ও শ্রীবরদী সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী (৫০)। তাদের শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ট্রলি চালক আশারুকে (২৫) শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

বড়াইগ্রাম (নাটোর) : বড়াইগ্রাম উপজেলার রামাগাড়ী শাহপাড়া গ্রামে ইজি বাইকের ধাক্কায় জহুরুল ইসলাম শাহ (৫৫) নামে এক মোটরসাইকেল চালকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। নিহত জহুরুল রামাগাড়ি শাহপাড়া গ্রামের মৃত আফসার শাহের ছেলে।

বন্দর (নারায়ণগঞ্জ) : বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে শ্রমিক সিদ্দিক মিয়া কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। মিল গেট থেকে বের হয়ে সড়কে আসার পর একটি ট্রাক তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত শ্রমিকের মেয়ে সীমা আক্তার বন্দর থানায় এসে বিনা ময়নাতদন্তে লাশ দাফনের আবেদন জানালে মৃতদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।