বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯ তম সম্মেলন নিয়ে ব্যস্ত পদ প্রত্যাশিরা

ক্যাম্পাস প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন আগামী ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর প্রতিক্ষিত এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই বিরামহীন সক্রিয়তা আর তৎপরতায় ব্যস্ত পদ প্রত্যাশীরা। দেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংগঠনটির নেতৃত্বে কারা আসছেন তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর কখনো যথা সময়ে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নি। এবারই প্রথম যথা সময়ে সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটি। আর এর মাধ্যমেই অনেকটা ব্যতিক্রমভাবেই রেকর্ড ভেঙে, মাত্র ২ বছর ৮ মাসের মাথায় সম্মেলনের মাধ্যমে পদ ছাড়তে যাচ্ছেন সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন।
আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে নেতৃত্ব বাছাইয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক ৬ নেতাকে। তারা হলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ও সদস্য মারুফা আক্তার পপি। তবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ শেষ পর্যন্ত দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই নির্ধারণ করবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আকস্মিকভাবেই সম্মেলনের ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যদিও এর আগে সম্মেলনপ্রত্যাশী বেশ কিছু নেতাকর্মী বিভিন্নভাবে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে। তারা তারিখ ঘোষণার জন্য সংবাদ সম্মেলন করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে তারা সংবাদ সম্মেলন থেকে ফিরে আসে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের কথিত সিন্ডিকেটের ওপর রুষ্ট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনায় ঢাবি ছাত্রলীগের সাবেক এক সভাপতির মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া নিয়েও ক্ষোভ অনেক সাবেক প্রভাবশালী নেতার। এ ছাড়া ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনেও বেশকিছু অভিযোগ জমা হয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এর মধ্যে ছাত্রদল ও শিবিরের বেশকিছু নেতার অনুপ্রবেশের ঘটনার প্রমাণ পায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। এসব নেতা সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের কাছের লোক হিসেবেও পরিচিত।
ছাত্রলীগের সাবেক বেশ কয়েক নেতা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটির অন্তত দুনেতার বিরুদ্ধে ছাত্রদল করার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়া একজনের বিরুদ্ধে রয়েছে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহৎ একটি হলের নেতার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ অনেক পুরনো। কিন্তু তাকেও একটি হলের সভাপতি বানানো হয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছেন বেশ কয়েকজন বিবাহিত নেতাও। ছাত্রদল থেকে অনুপ্রবেশ করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হয়েছেন শীর্ষ নেতৃত্বের বদৌলতে। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তিনি একজন শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই পরিচিত।
এর বাইরে কেন্দ্রীয় কমিটিতে বেশ কিছু সাংবাদিককেও পদ দেওয়া হয়েছে। যা ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য লঙ্ঘন হচ্ছে বলেও মনে করেন অনেক সাবেক নেতা। বিভিন্ন মাধ্যমে এসব অভিযোগ দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এমনকি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ জানানো হয়।
তবে সম্মেলনের দাবিতে আন্দোলনরত নেতারা বলছেন, সংগঠনের নিয়ম অনুসারে প্রতি দুই বছর পর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেই হিসেবে ইতিমধ্যে প্রায় আট মাস বিলম্ব হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, একাডেমিক ও সাংগঠনিকভাবে যোগ্য, দক্ষ, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং নিবেদিতদের সংগঠনটির নেতৃত্বে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে, বিতর্কিতরা যেন না আসতে পারে সে বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সংগঠন সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবে কি না এটিও যোগ্যতার মাপকাঠিতে রাখা হয়েছে।
ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদের দৌড়ে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটি’র মধ্যে থেকে এগিয়ে রয়েছেন শিক্ষা ও পাঠচক্রবিষয়ক সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ত্রাণ ও দুর্যোগবিষয়ক সম্পাদক ইয়াজ আল রিয়াদ, কৃষিবিষয়ক সম্পাদক বরকত হাওলাদার, বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-সভাপতি ভূঁইয়া মোঃ ফয়েজউল্লাহ মানিক,কর্মসূচিবিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন,প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাযহার শামীম,উপ-সম্পাদক সৈয়দ আরাফাত,উপ-সম্পাদক বেলাল হোসেন বিদ্যুৎ, ঢাবির সহ-সভাপতি শাহারিয়ার কবির বিদ্যুৎ,দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার শাহাজাদা প্রমুখ । এছাড়াও মেয়ে নেতৃত্বের গুঞ্জনে আলোচনায় আছে সহ-সভাপতি চৈতালি হালদার এবং উপ-সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদারের নামও ।
ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রব্বানী এবং ইয়াজ আল রিয়াদ স্বচ্ছ ইমেজধারী বলে কর্মীদের মধ্যে বেশ পরিচিত। আলোচিত একমাত্র মেয়ে চৈতালী চৈতী ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।
অন্যদিকে, যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মোকাবেলা করা নেতাদের সামনের সারিতে ছিলেন কৃষি সম্পাদক বরকত হাওলাদার।
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ববর্তী অস্থির পরিস্থিতিকালীন সময়ে যখন বিএনপি জামাত-জোটের পেট্রোল-ককটেল নিক্ষেপের মাধ্যমে জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি চলাকালীন অস্থির মূহূর্তগুলোতে আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রতিবাদে সার্বক্ষনিক মাঠে সক্রিয় ছিল যে কয়টি মুখ তাদের মধ্যে ভূঁইয়া মোঃ ফয়েজউল্লাহ মানিক অন্যতম । মোকাররম হোসেন ভবনে ককটেল নিক্ষেপ করে পালাতে চাইলে ছাত্রদল নেতা রয়েলকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা তাদের মধ্যে ফয়েজ অন্যতম।
দীর্ঘদিন ছাত্ররাজনীতিতে সর্বোচ্চ সক্রিয় থাকলেও ক্যাম্পাসে প্রত্যাশিত পদ বঞ্চিত হিসেবেই পরিচিত ফয়েজ । আন্দোলন- সংগ্রামে সক্রিয় হিসেবে রাব্বানী,বরকত,ইয়াজ,ফয়েজ, শাহারিয়ার বিদ্যুৎ,হাফিজ,আসিফ তালুকদার এই নামগুলো ঢাবি ক্যাম্পাসে বেশ পরিচিত এবং জনপ্রিয়। শীর্ষ নেতৃত্ব বাছাইয়ে এবার আলোচনার সর্বাগ্রে চট্রগ্রাম অঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গ । তবে বরিশালও আলোচনায় রয়েছে বলে জানা যায়। বয়স ২৯ বিবেচনায় ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোতাহের হোসেন প্রিন্সও পদ-প্রত্যাশী । উল্লেখ্য, গত ৬ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রা পূর্বক সমাবেশে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মার্চে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন করতে নেত্রীর ইচ্ছা কথা জানিয়ে দেন। এরপর সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করেন।