শেষ গোসল ও জানাজা না দিয়ে দাফনের অভিযোগ ফরিদগঞ্জে ৬৯ দিন পর কবর থেকে প্রবাসীর লাশ উত্তোলন

ফরিদগঞ্জের চরবসন্ত গ্রামের প্রবাসী সোহেলের মৃত্যুরহস্য নিয়ে নানা কানাঘুষা ও জল্পনা কল্পনার অবসান হয়েছে। লাশের গোসল এমনকি জানাজা না পড়িয়েই তড়িঘড়ি করে দাফন করার ঘটনা ঘটে। অবশেষে মমতাময়ী মায়ের দায়ের করা মামলার পর আদালতের নির্দেশে দাফনের ৬৯ দিন পর মোঃ সোহেল নামে ওমান প্রবাসী যুবকের লাশ গতকাল বুধবার কবর থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মমতা আফরিনের উপস্থিতিতে ফরিদগঞ্জ পৌরসভাধীন চরবসন্ত গ্রাম থেকে এ লাশ উত্তোলন করা হয়। উত্তোলনের পর ফুলপ্যান্ট পরিহিত অবস্থায় লাশটি দেখা গেছে। ফলে উপস্থিত শত শত লোকজনের আশঙ্কা সত্যিতে পরিণত হয়।

লাশ উত্তোলনের সময়ে উপস্থিত স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে বলেন, ওই সময়ে অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও গোসল না দিয়ে ও জানাজা না পড়িয়েই তড়িঘড়ি করে দাফন করা হয়েছিল লাশটি। ফলে একটি পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছিল। লাশ উত্তোলনের পর পুলিশ পোস্টমর্টেমের জন্যে চাঁদপুরে প্রেরণ করে।

সোহেলের স্বজনরা জানান, ফরিদগঞ্জ পৌরসভাধীন চরবসন্ত গ্রামের মৃত আব্বাছ হাজীর ছেলে মোঃ সোহেল তার চাচা মোঃ বাচ্চুর মাধ্যমে প্রায় দেড় বছর পূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে যায়। সেখানে যাওয়ার পর তার চাচা ও চাচার শ্যালকসহ একত্রে একই কোম্পানীতে কাজ করার সুবাদে একই রুমে বসবাস করত। সেখানেই চাচার শ্যালক ফয়সালের সাথে সোহেলের বিরোধ সৃষ্টি হয়। ঐ বিরোধের জের ধরে গত ৬ মে চাচা বাচ্চু ও ফয়সাল একত্রে মিলে সোহেলকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। কিন্তু ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে সোহেলের মারাত্মক ব্যাধি হয়েছে বলে সোহেলের বড় চাচা শাহাজাহানকে তারা ফোনে জানায়। শুধু তাই নয়, সোহেলকে ওমান থেকে বাংলাদেশে এনে চিকিৎসা করাতে হবে তাই সোহেলের মার স্বাক্ষর একটি সাদা কাগজে দিয়ে তাদের দেয়া ই-মেইলে পাঠাতে বলে তারা। সরল বিশ্বাসে সোহেলের মা পিয়ারা বেগম ছেলেকে বাঁচাতে সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে ই-মেইলে পাঠিয়ে দেন। এর ১১ দিন পর অর্থাৎ ১৭ মে ঘাতক চাচা বাচ্চু ভাতিজা সোহেলের লাশ নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। সুচতুর বাচ্চু তার লোকজন নিয়ে ঐ লাশের জানাজা না পড়িয়ে এবং লাশের গোসল না দিয়ে তড়িঘড়ি করে দাফন করার উদ্যোগ নেয়। এ সময় সোহেলের মা পিয়ারা বেগম, বড় চাচা শাহজাহান ও একমাত্র ভাই সোহাগসহ বাড়ির অন্যরা শেষবারের মতো সোহেলের মুখটি দেখতে চাইলে তা দেখাতেও অস্বীকৃতি জানায় বাচ্চু। শেষে চাপের মুখে পড়ে সোহেলের মৃতদেহটি দেখতে দেয়া হয়। এসময় সোহেলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমখমের চিহ্ন দেখা যায়। কীভাবে সোহেলের মৃত্যু হয়েছে জানতে চাইলে বাচ্চু বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছে। কখনো বলেছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে, কখনো বলেছে স্ট্রোক করে, কখনো বা বলেছে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে।

এদিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে সালিস করলে সালিসে ঘাতক বাচ্চু সোহেলের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আড়াই লাখ টাকা দিবে বলে স্বীকার করে। কিন্তু ক্ষতিপূরণের ঐ টাকা তিন মাস পরে দিবে বলে সে একটি বস্ন্যাংক চেক ও স্বাক্ষরযুক্ত একটি রেভিনিউ স্ট্যাম্প প্রদান করে। এদিকে এর কিছুদিন পর জোরপূর্বক তার কাছ থেকে বস্ন্যাংক চেক ও স্বাক্ষরযুক্ত একটি রেভিনিউ স্ট্যাম্প নেয়া হয়েছে দাবি করে বাচ্চু তা উদ্ধারের জন্যে চাঁদপুর আদালতে একটি মামলা করে।

অপরদিকে সোহেলেকে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে বাচ্চু ও তার শ্যালক ফয়সাল নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। শুধু তাই নয়, পুরো ঘটনাটি আড়াল করার লক্ষ্যে লাশের গোসল ও জানাজা না দিয়েই তড়িঘড়ি করে লাশটি দাফন করা হয়েছে উল্লেখ করে গত ১ জুলাই চাঁদপুর আদালতে সোহেলের মা পিয়ারা বেগম সোহেলের লাশ উত্তোলনপূর্বক পোস্টমর্টেম করা ও মৃত্যুর সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করে আসামীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে আবেদন করেন। পরে সি-আর আমলী আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ হাসান জামান ফরিদগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শককে বাদীনীর আবেদন এজাহার (এফআইআর) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দায়েরের আদেশ দেন। পরে ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ ৩ জুলাই এটিকে মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত শুরু করে। এরই মধ্যে পুলিশ কবর থেকে লাশটি উত্তোলনপূর্বক পোস্টমর্টেমের জন্যে আদালতে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করে। গতকাল বুধবার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মমতা আফরিনের উপস্থিতিতে চরবসন্ত গ্রাম থেকে এ লাশ উত্তোলন করার পর পোস্টমর্টেমের জন্যে চাঁদপুর প্রেরণ করে পুলিশ।

চরবসন্ত গ্রামের সোহেলদের প্রতিবেশী আবু তাহের (৬৫), আবুল হোসেন (৮৫), আঃ মতিন (৭৫) ও নান্নু মিয়া (৪৬) জানান, অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও গোসল না দিয়ে ও জানাজা না পড়িয়েই তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করা হয়েছে। তারা আরো জানান, গত ৬ মাস পূর্বে সোহেলের পিতা মোঃ আব্বাছ ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্রা এলাকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনার মারা যান। সেই মৃত্যুটিও একটি পরিকল্পিত হত্যাকা- হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।