বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে হাসপাতালে বাবা-মা’র ফেলে আসা হাজীগঞ্জের শিশুটির চিকিৎসারভার নিলেন…

বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে হাসপাতালে বাবা-মা’র ফেলে আসা হাজীগঞ্জের শিশুটির চিকিৎসার

ভার নিলেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন

স্টাফ রিপোর্টার:

চিকিৎসার টাকা না থাকার কারণে কুমিল্লার একটি হাসপাতালে নিজের সন্তানকে রেখে বাড়ি চলে আসেন হাজীগঞ্জের বাকিলা এলাকার ফুলছোঁয়া গ্রামের খান বাড়ির রোকেয়া-শাহ আলম দম্পতি। একমাত্র সন্তানকে হাসপাতালে রেখে এসে মা হলেন উন্মাদ আর বাবা হলেন নিরুদ্দেশ-এমন সংবাদে চারদিকে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কুমিল্লার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনের নজরে এলে তাঁরাই শিশুটির চিকিৎসার ভার নিলেন গত বুধবার থেকে।

শিশুটির পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শাহ আলমের গর্ভবতী স্ত্রী রোকেয়ার শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় গত ১৭ আগস্ট। এরপরেই হাজীগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারীর মাধ্যমে একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে এই নারী। মাত্র সাড়ে ৭ মাসে ডেলিভারী হওয়ার কারণে শিশুটির শারীরিক সমস্যা প্রকট হয়ে উঠে। এরপরেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শিশুটির পরিবারকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেয়া হয়। এরপরেই নিরূপায় পরিবারটি কুমিল্লা শহরের ঝাউতলার সিভিক স্কয়ারে কুমিল্লা মা ও শিশু স্পেশালাইজড হসপিটালে ভর্তি করান। সেখানে শিশুটিকে সেখানের আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া শুরু হয়। ১৮ আগস্ট থেকে শুরু করে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত এই চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির সিট কেটে দিয়ে বিল পরিশোধ করে শিশুটিকে অন্যত্র নিয়ে চিকিৎসা করতে বলে। বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে শিশুটির বাবা-মা শিশুটিকে হাসপাতালে রেখেই বাড়ি চলে আসেন।

এদিকে গত ২৪ আগস্ট বিকেল থেকে এই শিশুটির বাবা-মায়ের সন্ধান না পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় অভিযোগ জানান। এরপরেই বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে চলে আসে। ২৪ আগস্ট থেকে শুরু করে গতকাল বুধবার শিশুটির মা হাসপাতালের যাওয়ার আগ পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে চিকিৎসা চালিয়ে আসছিলো।

অপরদিকে দরিদ্রতার কারণে হাসপাতালে সন্তান ফেলে চলে যাওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর পরেই কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোঃ আবুল ফজল মীর, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম এবং জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মজিবুর রহমান শিশুটির চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল ব্যয় নির্বাহের আশ্বাস দেন। তারা গতকাল বুধবার শিশুটিকে দেখতে ওই হাসপাতালে যান। এর পূর্বে শিশুটির মা রোকেয়া বেগমকে খবর দিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে যান প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মকর্তাগণ। তবে বাবা নিরুদ্দেশ থাকার কারণে বাবাকে কিছুই জানানো সম্ভব হয়নি।

এর আগে গত মঙ্গলবার  কান্না জড়িত কণ্ঠে শিশুটির মা রোকেয়া বেগম বলেন, এর আগে দুটি সন্তান জন্ম নিলেও প্রথম সন্তানটি জন্মের তিন মাস এবং দ্বিতীয় সন্তানটি জন্মের দশ দিন পর মারা যায়। তারপর তৃতীয় সন্তানটিও সাত মাস বয়সে জন্ম নেয়। তাই সন্তানটিকে বাঁচানোর জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি করাই। কিন্তু হাসপাতালের ভর্তির ছয় দিনে চিকিৎসার বিল এক লাখ টাকার মতো হয়। এতো টাকা দেখে আমরা স্বামী-স্ত্রী চিন্তায় পড়ি। টাকার অভাবে চিকিৎসা খরচ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে বুকে পাথর চেপে বাচ্চাটিকে রেখে আমরা চলে যাই। তারপর বাড়ি ফিরে আমার স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তবে সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে এই নারী তখন আরো জানিয়েছেন, আমার সন্তানের চিকিৎসার ভার যদি সরকার নিতো তাহলে আমার বুকের ধনকে আমি ফিরে পেতাম।

কুমিল্লা মা ও শিশু স্পেশালাইজ্ড হস্পিটালের চিকিৎসক ডাঃ মেহেদী মুঠোফোনে  জানান, শিশুটি ৭ মাসে জন্মগ্রহণ করায় তার অবস্থা পুরোপুরি খারাপ ছিলো। প্রায় ৭ দিন পর হাসপাতাল বিল ৬৫ হাজার টাকা হয়। এ সময় হাসপাতাল অথরিটি শিশুটির বাবার কাছে কিছু টাকা পরিশোধের জন্যে বললে তারা আমাদেরকে না জানিয়ে চলে যায়। এরপর থেকে আজকে এখন পর্যন্ত শিশুটিকে আমরা চিকিৎসা দিয়ে আসছি। অন্য মা থেকে দুধ নিয়ে শিশুটিকে খাওয়ানো হচ্ছে। তবে পূর্বের থেকে সে এখন অনেক ভালো আছে। আর চিকিৎসা করালে শিশুটি হয়তো বেঁচে যাবে।

শিশুটির বাড়ির মানিক জানান, কুমিল্লা থেকে খবর পাওয়ার পরেই আজকে বুধবার শিশুটির মাকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। সেখানে শিশুটি এখনো ভালো আছে। তবে আমাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আর কোনো টাকা দিতে হবে না। কুমিল্লার সেই হাসপাতালেই এখন থেকে শিশুটির চিকিৎসা চলবে।

এদিকে বাকিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান ইফসুফ পাটোয়ারী জানান, শিশুটির হাপাতালের বিল পরিশোধের জন্য ইতিমধ্যে টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিলো। আর গতকাল আমার পরিষদ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র কুমিল্লা সিভিল সার্জন বরাবরে পাঠানো হয়েছে।