ফরিদগঞ্জে ব্যবসায়ীকে হত্যার চেষ্টা। আটক ১

প্রতিনিধি ঳

তারেকুল ইসলাম ভূ্ঁইয়া। বাইশ বছরের তরতাজা তরুণ। বাড়ি ফরিদগঞ্জের রূপসা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী নূরেরজ্জামান ভূঁইয়া বাড়ি। বাবা নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া এলাকায় সফু ডাক্তার নামে পরিচিত। তারেক রূপসা বাজারে মোবাইল ফোন সার্ভিসিংসহ আনুষঙ্গিক ব্যবসা করেন। গত কয়েক বছর একটি মার্কেটের ভেতর দোকান থাকলেও এক বছর পূর্বে তা দক্ষিণ বাজারের মূল গলিতে নিয়ে আসেন। ফলে কিছুটা হলেও ব্যবসা ভাল হয়েছে। সুঠাম দেহের অধিকারী সেই তারেককেই বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা হত্যার চেষ্টা করেছে।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য মতে, অনেকটা নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের মতো। মারধর করে অজ্ঞান করে হাত ও পা বেঁেধ এবং ব্যাগের মধ্যে ইট রেখে তার মধ্যে রশি বেঁেধ গলায় রশি ঝুলিয়ে দিয়েছে। আবার খালে এমনভাবে উপুড় করে ফেলেছে, যাতে দ্রুত সে পানি খেয়ে ও নিঃশ্বাস ফেলতে না পেরে মারা যায়। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে। গভীর রাতে খালের পানিতে ফেলে দেয়ার শব্দ রাতের নীরবতা ভেদ করে পার্শ্ববর্তী বাড়ির লোকজনের কানে পেঁৗছায়। দ্রুত খালের পাড়ে এসে উদ্ধার করায় ওই সময়ে বেঁেচ যান তারেক। যদিও এখন পর্যন্ত চিকিৎসাধীন থাকায় তিনি কতটুকু ঝুঁকিমুক্ত তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

তারেককে উদ্ধারকারী ষাটোর্ধ্ব ইব্রাহিম ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, রাত প্রায় ১২টার কাছাকাছি। এ সময় তার ভাতিজা আলমগীর তাকে ডেকে নিয়ে বলে, ভূঁইয়াদের খালে কে যেন পড়েছে। শব্দটি এত জোরে হয়েছে, ফলে তারা আতঙ্কিত। ইব্রাহিম সাহস দিয়ে আলমগীর, মন্না, আবু তাহের ও আবুল কালামকে সাথে নিয়ে খাল পাড়ে গিয়ে দেখেন, একটি মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে খালের মধ্যে। তিনি দ্রুত নেমে চিৎ করলেই চিনতে পারেন, মানুষটি আর কেউ নন, পাশের বাড়ির সফু ডাক্তারের ছেলে তারেক। বুকে কান পেতে শুনেন এখনো বেঁচে রয়েছেন। অন্য সকলের প্রচেষ্টায় হাত-পায়ের বাঁধন ও গলার রশি ছড়িয়ে উপরে টেনে তোলেন তারেককে। পরে সফু ডাক্তারকে ডাকলেও কোনো সাড়া পাননি। পরে তিনিসহ লোকজন রাস্তার কাছে নিতেই আশেপাশের লোকজন সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন। ছুটে আসেন তারেকের পরিবারের লোকজন। তার বোনের জামাতা সুমন পাটওয়ারী সংবাদ পেয়ে এসে তাকে প্রথমে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ েও পরে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান।

তারেক জানান, তিনি রাত ১১টার দিকে ডিম ও আটা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির অদূরে আসতেই পিছন থেকে তার মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করলে তিনি জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি ২/৩ জনের নাম উল্লেখ করেন, যাদের তিনি আঘাত প্রাপ্তির সময় দেখতে পেয়েছিলেন।

সরেজমিন গেলে তারেকের মমতাময়ী মা শাহানারা বেগম জানান, তারেক প্রতিদিন ১১টার দিকেই বাড়ি আসতেন। বুধবার রাত ৯টার দিকে বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর ঘরের জন্য সওদা লাগবে এবং নিজের প্রয়োজন অনুভব করে ঘরেই মোবাইল ফোন ও দোকানের চাবি রেখে যান। পরে তিনি শুনতে পান তার ছেলেকে হত্যা চেষ্টার কথা। তিনি জানান, তারেকের সাথে কারো কোন বিরোধ নেই। এ সময় তিনি দেখান তারেকের ব্যবহৃত ভেজা জামা কাপড়, গলায় ঝুলানো রশি, ব্যাগের মধ্যে থাকা ইট। তাদের সাথে পারিবারিক বিরোধ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, তার ভাসুরের পরিবারের সাথে বিরোধ রয়েছে। কিন্তু এজন্যে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা করতে হবে তা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।

ওই বাড়ির বাসিন্দা আইনজীবী হাসান মাহমুদ বলেন, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে আমরাও নিরাপদ নই। তারেকের বোনের জামাতা সুমন পাটওয়ারী জানান, রাত ১১টার দিকে সুমন বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির কাছাকাছি আসলে ৫/৬ জনের একদল দুর্বৃত্ত পেছন দিক তার উপর হামলা করে। মাথাসহ বিভিন্ন স্থানে ইট দিয়ে আঘাত করে অচেতন করে হাতে-পায়ে দড়ি বেঁধে এবং গলায় রশি পেঁচিয়ে তার সাথে ইট বেঁধে বাড়ির অদূরে খালের মধ্যে ফেলে দেয়। গুরুতর আহত তারেককে উদ্ধার করে প্রথমে ফরিদগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ েভর্তি করানো হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ ও উপস্থিত লোকজনের কাছে তারেক তাকে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় জড়িত কয়েকজনের নাম বলেন। সেই মোতাবেক পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে কামাল হোসেন নামে একজনকে আটক করেছে। সেই মোতাবেক বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বাদী হয়ে ফরিদগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানার ওসি শাহআলম জানান, পুলিশ সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে। এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে রূপসা বাজারে গেলে সর্বত্রই আলোচনার বিষয় ছিল তারেকের ওপর হামলার ঘটনা। এভাবে কে বা কারা কেন তারেককে মারার চেষ্টা করেছে তা প্রশ্ন সকলের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এভাবে হামলা ও মারার চেষ্টার ঘটনা মোটেও সুখকর নয়। নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের ঘটনাটির সাথে তারেকের ঘটনা মিলে যাওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক আরো বেড়ে গেছে। এই ঘটনাটি পারিবারিক বিরোধ, না অন্য কিছু তা দ্রুত উদ্ঘাটন এবং অভিযুক্তদের দ্রুত আটক করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানান তারা।