ফরিদগঞ্জে প্রকাশ্যে কিশোর হত্যার রহস্য উদঘাটন হলেও বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে

মো. শিমুল হাছান
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। বেঁচে থাকলে হয়তো এখন তাঁকে লিখতে হতো, ‘বিচারের বাণী সরবে প্রকাশ্যে কাঁদে’।
ফরিদগঞ্জ পৌর শহরে প্রকাশ্য দিবালোকে কিশোর ইসমাইল হত্যার ৯ বছর পর ২০১৫ সালে সিআইডি প্রতিবেদনে রহস্য উন্মোচন হলেও ২০১৮ সালে এসে ১১ বছর পার হয়েছে। ছেলে হত্যার বিচার পায়নি পরিবার।
সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে বদ্ধ পিতা মোস্তফা কামাল পুলিশ ও আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিচার চাইতে ক্রমেই শুকিয়ে আসছে বৃদ্ধ পিতার চোখের জল।
এ যেনো বিচারের বাণী সরবে প্রকাশ্যে কাঁদে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌরসভার পূর্ব বড়ালী গ্রামের ব্রদ্ধ মোস্তফা কামাল পেশায় একজন ভ্যানগাড়ি চালক। সম্পত্তিগত বিরোধে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ২০০৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে এ ভ্যানচালকের ছেলে কিশোর ইসমাইল হোসেনকে (১৬) প্রকাশ্যে বেদম মারধর করা হয়। পরে সে হাসপাতালে মৃতুবরণ করে।
নিহতের পিতার আদালতে দায়ের করা মামলার ৮ বছর পর ২০১৫ সালে সিআইডির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে বেরিয়ে এসেছে ইসমাইল হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য। সিআইডির অনুসন্ধানী কর্মকর্তা ছিলেন সিআইডি নোয়াখালী জেলার সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ।
সিআইডি প্রতিবেদনে উল্ল্যেখ করা হয়, ‘ময়না তদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট এবং পারিপাশ্বিক অবস্থা পর্যালোচনায় দেখা যায়, আসামী সহিদ বেপারী গংরা ফরিদগঞ্জ কালির বাজার চৌরাস্তা মোড়ে ইসমাইল হোসেনের পথরোধ করলে সে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করে। পরে তাকে আটক করে নির্মম ও নির্দয়ভাবে কিল, ঘুষি, লাথি মারার ফলে ইসমাইল হোসেন ফরিদগঞ্জ আদর্শ একাডেমি সংলগ্ন রাস্তার ওপরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। মারের চোটে তাৎক্ষণিক সে ঘটনাস্থলে মলমূত্র ত্যাগ করে। পরে অভিযুক্তরা আবার তাকে উদ্ধার করে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। ওই রাতে হাসপাতালে ইসমাইল হোসেন মৃত্যুবরণ করে।’
এদিকে সিআইডির দেয়া প্রতিবেদন অনুসারে ইসমাইল হোসেন নিহত হওয়ার অপমৃত্যুর মামলাটিকে দীর্ঘ ৯ বছর পর ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে। তবে পুলিশ অদৃশ্য কারণে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করছেন না বলে অভিযোগ করেছেন মামলার বাদী।
অপরদিকে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে হত্যা মামলার আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে এ হত্যাকে অপমৃত্যু বলে এতোদিন ব্যবহার করে আসছে। এছাড়া মামলার বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, সর্বশেষ চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি আবেদন করেন। আবেদনে তিনি পুত্র হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন।
পিতা মোস্তফা কামাল ছেলে হত্যার বিবরণ দিয়ে এপ্রতিনিধিকে বলেন, ‘সহিদ বেপারী গংরা আমার অসুস্থতার কথা বলে মোবাইল ফোনে আমার ছেলেকে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসতে বলে। ঘটনার দিন বিকালে কালির বাজার চৌরাস্তায় সে গাড়ি থেকে নামা মাত্র সহিদ বেপারী, মিলন বেপারী, নূর মোহাম্মদ বেপারী, বিল্লাল হোসেন বেপারী, সোহেল রানা, বাবুল বেপারী, আব্দুল মান্নান ও আবুল কালাম আমার ছেলেকে মারধর শুরু করে। সে দৌঁড়ে ফরিদগঞ্জ আদর্শ একাডেমি সংলগ্ন রাস্তায় পড়ে যায়। একপর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়লে আসামীরা তার মুখে বিষ ঢেলে দেয়। আসামীরা এলাকাতে অপপ্রচার চালায় ইসমাইল হোসেন মোবাইল চুরির ঘটনায় ধরা খেয়ে অপমান-অপদস্ত হয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিআইডির দেয়া প্রতিবেদনের পর পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করে। তবে আসামীরা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুরে বেড়ালেও অদশ্যৃ কারণে তাদের গ্রেফতার করছে না। সর্বশেষ আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পুত্র হত্যার বিচার চেয়ে একটি আবেদন করি। যার প্রেক্ষিতে চাঁদপুর জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাজীগঞ্জ সার্কেল আফজাল হোসেন সোমবার (৮ অক্টোবর) ঘটনার তদন্ত করতে আসেন।’
দ্রুত সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে বৃদ্ধ মোস্তফা কামাল আরো বলেন, ‘আমি প্রশাসনের কাছে আসামীদের গ্রেফতার ও আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের আবেদেন জানাচ্ছি এবং আদালতের কাছে ঘটনার সঠিক তদন্তপূর্বক আসামীদের ফাঁসি দাবি করছি।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই মোবারক চাঁদপুর টাইমসকে বলেন, ‘সর্বশেষ এসপি সার্কেল আফজাল স্যার মামলাটি নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। এখনও মামলাটি তদন্তাধীন আছে। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেয়া হবে।’
তবে অভিযুক্ত সহিদ বেপারী সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন মিথ্যা দাবি করে ও বাদীর আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে এ প্রতিনিধিকে বলেন,‘ ইসমাইলকে আমরা কেউ মারধর করিনি। সিআইডি প্রতিবেদন মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের জড়ানো হয়েছে। ইসমাইল যে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে তা স্থানীয় লোকজন প্রত্যক্ষ করেছে।’
মেডিকেল ও থানা পুলিশের বরাতে অভিযুক্তের দাবি, ইসমাইল আত্মহত্যা করেছে। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মূলতঃ আমাদেরকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মোস্তফা কামাল মিথ্যা অভিযোগ করে যাচ্ছেন।