চাঁদপুরের নদীতে ইলিশের আকাল কাটছেনা,দামে আগুন

স্টাফ রিপোর্টার:॥ শ্রাবনের মাঝামাঝিতে বঙ্গোপসাগরে এবং হাতিয়ার নদী ও সাগর মোহনায় ইলিশের দেখা মিলেছে। সাগরে আহরিত ইলিশের কিছু অংশ হাতিয়া থেকে সড়ক পথে এবং ভোলা দৌলত খা থেকে নদী পথে চাঁদপুর আসায় অবশেষে মন্দা কাটিয়ে ইলিশের নগরী খ্যাত চাঁদপুর মাছঘাটে স্বস্থি ফিরে এসেছে।ইলিশ আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রমের ফলে ঘাটের অধিকাংশ মৎস্য আড়ত এখন সরগরম ।কিন্তু লোকাল নদীতে মাছের দেখা নেই। ইলিশসহ নদ-নদীর অন্য সব মাছের আকাল এখনও চলছে।শহর কিংবা গ্রামের হাট-বাজারে যে পরিমান মাছ উঠছে চাহিদার তুলনায় তা খুবই কম।ইলিশসহ নদীর মাছের দামে আগুন বিরাজ করছে। সাধারনতঃ নদীর মাছ বলতে চাঁদপুরের গুড়া চিংড়িসহ অন্যান্য ছোট ছোটমাছ কিছুটা বাজারে পাওয়া যায়।দাম অনেক বেশি, কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫/৬’শ টাকা থেকে ৮/৯’শ টাকায়। তাতে সাধারণ মানুষ হাত দিতে পারছে না। তাদের ক্রয় ক্ষমতায় নাগালের বাহিরে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মাছের এই আকালকে মোকাবেলা করছেন সাগরের পচা মাছ খেয়ে। তাদের একটু ভরসা পুকুর ও ঝিলে চাষকরা পাংগাস আর খাঁচার হাইব্রিড তেলাপিয়া।চাঁদপুর শহরের পুরাণবাজার নতুন রাস্তার ওপর গড়ে উঠে অস্থায়ী বাজারসহ বিভিন্ন হাট-বাজার,মাছঘাট পর্যবেক্ষণ, মৎস্য ব্যবসায়ি,আড়ৎদার ও জেলেদের সাথে আলাপ করে জানা যায়- শীতে নদ-নদীর বিভিন প্রজাতির মাছের পোনা নির্বিচারে নিধন । গেল দুই মাসের জাটকা রক্ষা অভিযান সফল না হওয়া ,কম ফাঁসের গুলতি , কোনা,বাধাজাল ও কারেন্টজাল দিয়ে নদী ছেঁকে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে নদ-নদীর মাছের এই দুষ্প্রাপ্যতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে চাঁদপুর মাছঘাটে সরজমিনে গিয়ে জানা যায় হাজী আঃ মালেক খন্দকার,গফুর জমাদার,কুদ্দুছ খান,শবেবরাত কোম্পানী,রব চোকদার ও আনোয়ার গাজীর আড়তে গত এক সপ্তাহে ভরপুর সাগরের ইলিশ এসেছে।এসব আড়তের ইলিশে মাছঘাটের চেহারাও পাল্টে গেছে। লোকাল মাছ তেমন না থাকলেও নামার ইলিশে চাঙ্গা স্থানিয় ইলিশের বাজার।
চাঁদপুর বরফকল মালিক সমিতির ম্যানেজার মনির হোসেন জানান,আমাদের এই জায়গার নদীতে মাছ নাই।নামায় ইলিশ ধরা পরায় আগের তুলনায় এখন বরফ বিক্রি কিছুটা ভালো যাচ্ছে।আমাদের সমিতির ৫টা কলই এখনচলছে। সমিতির বাহিরে অন্য বরফকলগুলোও চালু আছে।
ঘাট থেকে ইলিশ কিনে হাজীগঞ্জ স্টেশান রোডের বালুর মাঠে মাছ বিক্রি করেন পুরাণবাজার ম্যারকাটিজ রোডের সাইফুল (৩০)। সে জানায়,৭/৮ টায় এক কেজি পোনা ইলিশের দাম পাইকারি দাম ৩’শ টাকা,প্রতি মণ ১২ হাজার টাকা।সাড়ে ৪ ও ৫’শ গ্রাম ওজনের ইলিশের মণ ২০ হাজার টাকা,কেজি ৫’শ টাকা।৬/৭’শ গ্রাম সাইজের ইলিশের মণ ২৮/২৯ হাজার টাকা। এই সাইজের ইলিশের কেজি আড়তের ঘরেই ৭’শ ২৫ টাকা । এক কেজি সাইজের ইলিশের মণ ৫০-৫২ হাজার টাকায় কেনা হয়। সিজনে এমন দাম হলে গরীব মানুষ ইলিশ খাইব কিভাবে।
হাইমচর কাটাখালি সফিক দেওয়ান মৎস্য আড়ের জেলে লক্ষণ দাস ও চাঁদপুর শহরের ৩নং কয়লা ঘাটে অবস্থান নেয়া কালু ভূঁইয়ার জেলে সুজন দাস জানান, চাঁদপুর নৌ-সীমানায় মাছের অবস্থা ভালো না,খোরাকির পয়সা হয়না। দুই খেও দিয়ে ৩/৪ হাজার টাকার মাছ পায়।অভিযানের পর থেকে মাছের পরিস্থিতি খুবই খারাপ যাচ্ছে।এক এক নৌকা দেড়-দুই রাখ টাকা দেনা ।
চাঁদপুর সদর উপজেলার আখনেরহাট বাজারের মৎস্য আড়তদার খলিলুর রহমান ও গিয়াস উদ্দিন জানান, দুই মাসের অভিযানে জাটকা মাছ ধইরা খাইয়া লাইছে,এই জন্য জেলেরা এখন নদীতে মাছ পাচ্ছেনা। হাইমচরের নয়ারহাট ও চাঁদপুর হরিণা ফেরিঘাটের কোণা জালের নৌকায় তারা কিছু মাছ পায় ,তাও ছোট ছোট মাছ।
চাঁদপুর মৎস্য ব্যবসায়ি সমিতি’র সহ-সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার মানিক জানান, লোকালে মাছ একেবারেই কম।গভীর সাগরে আর হাতিয়া এলাকায় ধরা পড়া ইলিশের চালান নিয়ে মাছঘাট এখন কিছুটা সচল দেখা যাচ্ছে। আমাদের এই নদীতে পদ্মা-মেঘনায় মৌসুমে ইরিশ না পাবার কারণ দুই মাসের জাটকা রক্ষার অভিযান ভালো হয় নাই। এছাড়া ভরা বর্ষায় নদীতে পানি কম, নদীর বিভিন্ন স্থান দিয়ে ডুবোচর। সাগর থেকে হাতিয়া,ভোলা,লক্ষ্মীপুর হয়ে চাঁদপুরের নদীতে মাছটা যে ঢুকবো, ডুবোচরের কারনে আসতে পাছেনা।লোকালে মাছ না পাওয়ার এই পরিস্থিতি ইলিশের জন্য ভালো না,অশনি সংকেত বলে মনে করেন এই মৎস্য ব্যবসায়ি।তার মতে,ইলিশ মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে। সাগর মোহনা থেকে বিভিন্ন প্রতিকূলতায় উপরে আসতে পারছেনা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকী জানান,মাছ নদীতে আসার মত পরিবেশ তৈরি হয়নি।মাছের যে মাইগ্রেশন দরকার,পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে ¯্রােত বাড়তে হবে। আমাদের সীমিত লজিষ্ট্রিক সার্পোট ও জনবল নিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি জাটকা রক্ষা করতে।তবে তিনি আশাবাদী আশি^ন-ভাদ্রমাসে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে।
চাঁদপুর জেলার মৎস্য বিভাগের তথ্য সূত্রে জানা যায়,চাঁদপুর জেলার নিবন্ধিত মোট জেলের সংখ্যা ৫৭ হাজার ৩০৫ জন।চাঁদপুর সদর,হাইমচর,মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় মোট নিবন্ধিত জাটকা/ইলিশ মৎস্য জীবির সংখ্যা ৫১ হাজার ১৯০জন।২০১৬-১৭ সালে নদী থেকে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৩৫৪২৭.০০মে.টন।এবার বর্ষার শ্রাবন শেষ পর্যায়। এখনও প্রত্যাশিত ইলিশ ধরা পড়ছে না। সামনে কোরবানীর ঈদ। নদীতে মাছ ধরা না পাওয়ায় চরম হতাশ জেলেরা। সবাই অপেক্ষার প্রহর গুণছেন,ইলিশ আল্লাহর দানীয় মাছ। আল্লাহ দিলে মাছ পাবেন।
ছবি ক্যাপশনঃ চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ না পাওয়ায় ঘাটে জাল-নৌকা নিয়ে অলস সময় কাটাচ্ছে জেলেরা। নদীরপাড়ে মৎস্য আড়তে ইলিশ পরিস্থিতি এখন এমনই।ছবি দুটি শহরের কয়লাঘাট ও সদর উপজেলার আখনেরহাট থেকে তুলেছেন মিজানুর রহমান।