আজ বুধবার, জানুয়ারী ১৮, ২০১৭ ইং, ৫ মাঘ ১৪২৩

ডাহা ভুলে চোখ বুজে নম্বর

Monday, January 9, 2017

শরীফুল আলম সুমন 

কুনো ব্যাঙকে কেন উভচর প্রাণী বলা হয়?—গত বছরের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ে এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। সঠিক উত্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই নম্বর।

প্রশ্নটির উত্তরে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী খাতায় লিখেছে—কুনো ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে চলে বলে একে উভচর প্রাণী বলা হয়। আরেকজন লিখেছে—কুনো ব্যাঙ ঘরের কোণে থাকে বলে একে উভচর প্রাণী বলা হয়। দুটি উত্তরই ভুল। তবু পরীক্ষক উভয় শিক্ষার্থীকেই এক নম্বর করে দিয়েছেন।

সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ে আরেকটি প্রশ্ন ছিল—চাঁদে গেলে বস্তুর ওজন কেমন থাকে? উত্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল তিন নম্বর। প্রশ্নটির উত্তরে একজন পরীক্ষার্থী লিখেছে, ‘চাঁদে গেলে বস্তুর ওজন শূন্য হয়ে যায়। কারণ আমরা চাঁদে গেলে সবাই বাটুল হয়ে যাব। ’ আরেকজন শিক্ষার্থী লিখেছে, ‘চাঁদে গেলে আমরা সবাই ডরিমনের মতো হয়ে যাব। ’ উত্তর ভুল হলেও পরীক্ষক তিনের মধ্যে এক-দুই করে নম্বর দিয়েছেন।

সাধারণ বিজ্ঞানেই আরেকটি প্রশ্নে ‘জহির সাহেবের খাদ্যাভ্যাসের’ বর্ণনাসংবলিত একটি অনুচ্ছেদ দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, জহির সাহেবের কী পরিমাণ শর্করা প্রয়োজন? উত্তরে একজন শিক্ষার্থী লিখেছে, ‘জহির সাহেবের বেশি করে মাছ, মাংস ও শাকসবজি খেতে হবে। ’ অথচ এ খাবারগুলোর কোনোটিই শর্করা নয়। প্রশ্নটির উত্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল চার নম্বর। পরীক্ষক দিয়েছেন দুই।

একই বিষয়ের পরীক্ষায় ‘বাঘ ও কুমির প্রাণিজগতের কোন শ্রেণিভুক্ত প্রাণী’—এ প্রশ্নের উত্তরে এক শিক্ষার্থী লিখেছে, বাঘ ও কুমির মাংসাশী প্রাণী। তারা উভয়েই ভয়ংকর প্রাণী। সামনে পেলেই মানুষ খেয়ে ফেলে। প্রশ্নটির উত্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল চার নম্বর। তবে ওই শিক্ষার্থীর উত্তর ভুল হলেও দুই নম্বর দিয়েছেন পরীক্ষক।

জেএসসি পরীক্ষার খাতা দেখা শেষে নিজের নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন পরীক্ষক কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক প্রশ্নের উত্তরই ডাহা ভুল লিখেছে পরীক্ষার্থীরা। তাদের ফেল করার কথা। কিন্তু প্রধান পরীক্ষক বলে দিয়েছেন, কাউকে ফেল করানো যাবে না। তাই উত্তর ভুল হলেও নম্বর দিতে বাধ্য হয়েছি। ’

জেএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ১ নভেম্বর, শেষ হয় ১৭ নভেম্বর। ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২৯ ডিসেম্বর। পাসের হার ছিল ৯৩.০৬ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৮ জন। ২০১৫ সালের তুলনায় গত বছর জেএসসিতে পাসের হার বেড়েছে ০.৭৩ শতাংশ। আর আগের বছরের তুলনায় গত বছর জিপিএ ৫ বেশি পেয়েছে ৫১ হাজার ৩২৫ শিক্ষার্থী।

জেএসসি পরীক্ষায় ২০১৩ সালে পাসের হার ছিল ৮৯.৯৪ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯০.৪১ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ছিল ৯২.৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবছরই পাসের হার বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছর জেএসসি পরীক্ষা শেষে একজন পরীক্ষককে প্রথম দফায় ১০০টি খাতা দেওয়া হয়েছিল। সহানুভূতির সঙ্গে খাতা দেখে মুক্তহস্তে নম্বর দেওয়ার পরও এর মধ্যে দুজন ফেল করে। বিষয়টি জানানো হয় প্রধান পরীক্ষককে। তিনি (প্রধান পরীক্ষক) যেকোনোভাবে ওই পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দিতে বলেন। নইলে তাঁদের দুজনকেই (পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক) শাস্তি পেতে হবে বলে জানান। তবে ওই পরীক্ষক শেষ পর্যন্ত ওই দুই শিক্ষার্থীকে পাস করাননি। এরপর তাঁকে আরো ১০০টি খাতা দেওয়া হয়। এবার আর ঝুঁকি নেননি তিনি; উত্তরে যা-ই লেখা থাকুক, সবাইকে পাস করিয়ে দিয়েছেন।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরীক্ষার খাতা দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরীক্ষকদের মৌখিকভাবে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়। সব পরীক্ষককে সহানুভূতির সঙ্গে খাতা দেখতে বলা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, ফেল করানো হলে শিক্ষার্থীদের মনোবল ভেঙে যাবে। অনেকে পড়ালেখাও বাদ দেবে। পরীক্ষকদের এ বিষয়টি মাথায় রাখতে বলা হয়।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষা বোর্ডগুলো পরীক্ষকদের কাছে খাতা বুঝিয়ে দেওয়ার পর প্রধান পরীক্ষকরা তাঁদের আরেক দফা চাপ দেন। তাঁরা পরীক্ষকদের উদারভাবে খাতা মূল্যায়নের জন্য চাপ দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীরা ফেল করলে পরীক্ষকদের শাস্তি পেতে হবে বলেও হুমকি দেন। ফেল করালে পরের বছর আর পরীক্ষক করা হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। একটি বান্ডেলে (১০০ খাতা) এক-দুজনের বেশি ফেল করলেই অনেক প্রধান পরীক্ষক পরীক্ষকদের ধমক দিয়ে নতুন করে খাতা দেখতে বলেন।

পরীক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেতন-ভাতার বাইরে খাতা দেখা থেকেও পরীক্ষকরা অর্থ পান। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষক না করলে এই টাকা পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা থেকে উদারভাবে নম্বর দিতে বাধ্য হন পরীক্ষকরা। এ ছাড়া পরীক্ষক হতে না পারলে একজন শিক্ষকের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়।

কয়েকজন পরীক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু অলিখিত নিয়মকানুন রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী ২০ নম্বর পেলে তাকে পাস করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ৬০ পেলে তাকে ৭০ বানিয়ে ‘এ’ গ্রেড, ৫০ পেলে তা ৬০ বানিয়ে ‘এ মাইনাস’, ৪০ পেলে ৫০ বানিয়ে ‘বি’ গ্রেড এবং ৩০ পেলে ৪০ বানিয়ে ‘সি’ গ্রেড করা হয়। আর ৬৫ থেকে ৭০ নম্বর পেলে চেষ্টা থাকে তাকে জিপিএ ৫ অর্থাৎ ৮০ নম্বর দেওয়ার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রধান পরীক্ষক বলেছেন, ‘খাতা দেওয়ার সময় বোর্ড কর্তৃপক্ষ আমাদের উদারভাবে নম্বর দেওয়ার বিষয়ে আকারে-ইঙ্গিতে নানা নির্দেশনা দেয়। এতে আমরা বুঝে যাই কী করতে হবে। আর ফেল করা শিক্ষার্থীরা পরে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করে। পুনর্নিরীক্ষণ-প্রক্রিয়ার সময় অনেক ঝামেলা হয়। তা এড়াতেও পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। ’

তবে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাউকে উদারভাবে খাতা মূল্যায়নের কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না। যে যা পাবে, তাকে সে নম্বরই দিতে হবে। আমরা প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষক, সবাইকে একই কথা বলি। আমরা বলি জাস্টিস মেইনটেন করবেন। কাউকে বঞ্চিত করবেন না, আবার কাউকে অযথা বেশি নম্বর দেবেন না। ’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের জেএসসি পরীক্ষার চারু ও কারুকলা এবং ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের খাতায় অনেক শিক্ষার্থী অসংলগ্ন ও ভুল উত্তর লিখেছে। তা সত্ত্বেও পরীক্ষকরা তাদের নম্বর দিয়েছেন। এমনকি আবোলতাবোল উত্তর লিখলেও অনেক পরীক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক পরীক্ষার্থীর জিপিএ (গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজ) বাড়ানো হয়েছে।

২০১৫ সালের জেএসসি পরীক্ষার চারু ও কারুকলা বিষয়ের দুটি খাতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক পরীক্ষার্থী ৪০ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিকের মধ্যে মাত্র আট পেয়েছে। অথচ ৬০ নম্বরের রচনামূলকে পেয়েছে ১৭ নম্বর। আরেক পরীক্ষার্থী নৈর্ব্যক্তিকে পেয়েছে ১৪, অথচ রচনামূলকে পেয়েছে ২৬ নম্বর। যদিও শিক্ষকরা বলছেন, রচনামূলকের চেয়ে নৈর্ব্যক্তিকে নম্বর পাওয়া অনেক সহজ। যারা নৈর্ব্যক্তিকে খারাপ করেছে তারা রচনামূলকে ভালো করে কিভাবে?

শিক্ষকরা বলছেন, নৈর্ব্যক্তিকে ভুল হলে নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু রচনামূলকে পরীক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক না কেন তাতেই নম্বর দেওয়া হয়েছে। মূলত ওই দুই পরীক্ষার ক্ষেত্রেও পরীক্ষার্থীরা যা কিছু লিখেছে তাতেই মুক্তহস্তে নম্বর দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের জেএসসির চারু ও কারুকলা বিষয়ের পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থী প্রাচীন জনপদের বর্ণনার উত্তরে লিখেছে, ‘মাটি খুঁড়ে আহছান মন্দির প্রাচীন জনপদ আবিষ্কারে হয়েছে। প্রাচীন কালে নানা রকম জনপদ তৈরি করা হয়েছে। এগুলো তৈরি করা হয়েছিল নানা রকম পাথর দিয়ে। পাথর অনেক ভারি। তাদের মধ্যে অনেক জনপদ ধ্বংস হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক জনপদ মানুষ নানাভাবে নলকূপ তৈরি করেছে। জনপদের কাছে নানা রকমভাবে পুকুর খনন করেছে। যার জন্য অনেক জনপদ নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের দেশে নানা রকম প্রাচীন জনপদ রয়েছে। যা অনেক পুরাতন হয়ে গেছে। যার ফলে অনেক সুন্দর প্রাচুর্য নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা জানতে পারি যে জনপদগুলো বানাতে মানুষের অনেক সময় লেগে গেছে। যেগুলো বেশি ভালো পাথর দিয়ে বানানো হয়েছিল। সেগুলো বেশি দিন টিকে থাকে। আমাদের দেশে নানা স্থানে নানা রকম প্রাচীন জনপদ আছে। যা আমরা দেখতে পারি। প্রাচীন জন পদ দেখতে অনেক সুন্দর। আমরা দেখলে মনে হবে যেন কয়েক দিন হয়েছে বানানো। জনপদ সৃষ্টি করে ছিল আগের মানুষে। যা দেখতে অনেক সময় লেগেছে। প্রাচীন জনপদ আমাদের দেশের একটি বড় অংশ। তাই আমরা সকলেই আমাদের প্রাচীন জনপদকে ভালো ভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করব। ’ অসংলগ্ন উত্তর দিলেও ওই পরীক্ষার্থীকে চার নম্বর দেওয়া হয়েছে।

২০১৬ সালের এসএসসির ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের দুটি খাতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক প্রশ্নের ভুল উত্তর লেখা সত্ত্বেও পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দিয়েছেন পরীক্ষকরা। যেসব উত্তর লেখা হয়েছে তাতে কোনোভাবেই ‘এ প্লাস’ (৮০ নম্বর) পাওয়ার কথা না থাকলেও নম্বর বাড়িয়ে তাদের ৮০ দেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর পাস নম্বরও (৩৩ নম্বর) পাওয়ার কথা না, অথচ তাকে ৪০ দেওয়া হয়েছে।

ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে ৮০ নম্বর পাওয়া এক শিক্ষার্থী শূন্যস্থান ও এককথায় উত্তর জাতীয় প্রশ্নে কম নম্বর পেলেও বর্ণনাত্মক প্রশ্নের উত্তর লিখে বেশি নম্বর পেয়েছে। দেখা গেছে, বর্ণনাত্মক বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে কম নম্বর দেওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ১১ নম্বর প্রশ্নে বড় হাতের অক্ষর ও যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার করে একটি অনুচ্ছেদ সাজিয়ে লিখতে বলা হয়েছিল। ওই শিক্ষার্থী উত্তরে ভুল করলেও তাকে পাঁচ নম্বরের মধ্যে চার দেওয়া হয়েছে। আবার ১৩ নম্বর প্রশ্নে স্কুলে ক্যান্টিন স্থাপনের জন্য আবেদনপত্র (উত্তরের জন্য নম্বর বরাদ্দ ছিল ১০) এবং ১৫ নম্বর (নম্বর বরাদ্দ ছিল ১২) প্রশ্নে ‘শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব’ সংক্রান্ত একটি অনুচ্ছেদ লিখতে বলা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে প্রথমে দেওয়া নম্বর কেটে পরে ওই শিক্ষার্থীকে যথাক্রমে আট ও ১১ নম্বর করে দেওয়া হয়েছে।

এসএসসির ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে ৪০ নম্বর পাওয়া ওই শিক্ষার্থীর খাতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সে মূলত প্রশ্নপত্রে দেওয়া অনুচ্ছেদটিই খাতায় তুলে দিয়েছে। এর পরও তাকে পাঁচের মধ্যে চার নম্বর দেওয়া হয়েছে। আর ১৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবর ক্যান্টিনের জন্য আবেদনপত্রে সম্বোধনের পর সে লিখেছে, ‘আওয়ার স্কুল ইজ ওয়ান অব দ্য অফ ম্যাটস স্কুল ইন দিজ এরিয়া। সো মাস্ট অফ দি সেটিং ক্যানটিং। দি স্কুল অন সেটিং এ লং টাইম ইন স্কুল। ’ এমন অসংলগ্ন উত্তর দেওয়ার পরও সাড়ে তিন নম্বর দেওয়া হয়েছে তাকে। ১৪ নম্বর প্রশ্নে ‘দ্য লাইফ অব অ্যা স্ট্রিট হকার’ সংক্রান্ত ২৫০ শব্দের একটি প্যারাগ্রাফ লিখতে বলা হয়েছিল। ওই শিক্ষার্থী লিখেছে—‘A street hawker deals in various by things hawking from street to street. He carries materials on had and sometimes on hand and sometimes in the handcart. He religions has goods at a apehar rate and sell them at a good profile. A street hawker is very cunning. He knows his business ir very well. His customers are children and women. He bring toys, sweel and other thigs and sells them at a fixed price at a good rate. His also bring toys bangles, ribbons, clothings, freviw, fruits fo other a street hawker. A street hawker is very cunning ofter peoplw in our country igron them sell even also hare tham.’

এমন আবোলতাবোল লিখলেও পরীক্ষক ওই পরীক্ষার্থীকে ১০-এর মধ্যে চার নম্বর দিয়েছেন। তার খাতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এভাবে নম্বর না দিলে শিক্ষার্থীটি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে নির্ঘাত ফেল করত।

গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ছিল। ফল প্রকাশিত হয় ১৮ আগস্ট।

গত ১৫ বছরের এসএসসি ও এইচএসসির ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাসের হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মান তলানিতে ঠেকেছে। আগের তুলনায় গড় শিক্ষার মান বাড়ছে না।

২০০১ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৩৫.২২ শতাংশ। ২০০৪ সালে হয় ৪৮.০৩ শতাংশ। ২০০৬ সালে তা বেড়ে হয় ৫৯.৪৭ শতাংশ। এরপর আবার ২০০৭ সালে পাসের হার কমে হয় ৫৭.৩৭ শতাংশ। তবে এরপর পাসের হার বেড়েই চলেছে। ২০১৩ সালে ছিল ৮৯.০৩ শতাংশ, ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ হার ছিল ৯১.৩৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে এই হার ছিল ৮৮.২৯ শতাংশ।

এইচএসসিতে ২০০১ সালে পাসের হার ছিল ২৮.৪১ শতাংশ। ২০০৪ সালে ছিল ৪৭.৭৪ শতাংশ। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩.৯২ শতাংশ। এরপর পাসের হার বাড়তেই থাকে। ২০১৪ সালে পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ, ৭৮.৩৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৭৪.৭০ শতাংশ।

সূত্র জানায়, মুক্তহস্তে খাতা মূল্যায়নে পাসের হারের সঙ্গে বাড়ছে জিপিএ। তবে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করছে অনেক শিক্ষার্থী। এমনকি ভর্তি পরীক্ষার সব প্রশ্ন পাঠ্য বই থেকে আসার পরও শিক্ষার্থীরা উত্তর দিতে পারছে না।

২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি বিষয়ে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল। ওই বছর এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েও ভর্তি পরীক্ষায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ফেল করেছিল। এ নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনাও হয়। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বিভিন্ন অনুষদে শিক্ষার্থীদের গড় পাসের হার ছিল ১১ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে একটা প্রশ্ন ভালোভাবে লিখলে ১০-এর মধ্যে ৮-৯-এর ওপরে দেওয়া হতো না। কিন্তু এখন ১০-এর মধ্যে ১০ দেওয়া হয়। এর ফলে আগে ১০০ নম্বরের মধ্যে যারা ৬০-এর ওপরে পেত তারা এখন ৮০ পাচ্ছে। এটাকে যদি উদারনীতি বলা হয় তাহলে তা-ই চলছে। তবে খাতা দেওয়ার আগে পরীক্ষকদের বলা হয়, যার যা প্রাপ্য তাই দেবেন। কাউকে কমও দেবেন না, বেশিও দেবেন না। আগে একজন শিক্ষার্থীর ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পড়ালেখা করতে হতো। কিন্তু এখন দুই-চার ঘণ্টা পড়লেই হয়। পড়ালেখা এখন একটা সিস্টেমিক পর্যায়ে চলে এসেছে। ’

এ বিষয়ে কথা হয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উদারভাবে খাতা মূল্যায়নের কথা পত্রপত্রিকায় প্রায়ই দেখি। আপনার কাছেও শুনলাম। সত্যিই এমনটা হয়ে থাকলে তা হবে আত্মবিধ্বংসী। আমাদের বোঝা দরকার, আমরা কাকে ঠকাচ্ছি? এটা মূলত আত্মপ্রতারণা। আমরা নিজেরাই নিজেদের পিছিয়ে দিচ্ছি। দেখানো হচ্ছে আমরা মেধাবী হয়ে গেছি। এটা ভুল নীতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এখন দুই থেকে ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মেধা কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। এভাবে চলতে থাকলে একটা প্রজন্ম খুব দুর্বল থেকে যাবে। ’

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পদ্ধতিগত একটা সমস্যা আছে। আগে ৬০ পেলে প্রথম বিভাগ পেত। সেটাই ছিল সর্বোচ্চ। এখন ৮০ নম্বর হলে ‘এ প্লাস’। তাই উদারভাবে ৬০-এর বদলে ৮০ নম্বর দেওয়া হচ্ছে। একটা পদ্ধতি থেকে আরেকটি পদ্ধতিতে যাওয়ার এটা একটা সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তির পর প্রতিবারই আমি ১০ জন জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ডেকে নিতাম। তাদের ১০ লাইন বাংলা ও ১০ লাইন ইংরেজি লিখতে দিতাম। দেখা যেত, তাদের মধ্যে দুজন ভালো পারে, দুজন মোটামুটি আর বাকি ছয়জন পারেই না। এই ছয়জন জিপিএ ৫ পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা নেই বলেই মনে হয়। আসলে যত বেশি পাস করবে তত বেশি মান বাড়বে, এটা সরকারের ভুল চিন্তা। যোগ্যতা না থাকলে নম্বর দেওয়া গর্হিত কাজ। আমার প্রস্তাব থাকবে কোনোভাবেই নম্বর বেশি দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের মান বাড়াতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) চৌধুরী মুফাদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উদারভাবে নম্বর দেওয়ার কথা আমার জানা নেই। তবে শিক্ষকদের একটা প্রবণতা আছে ৩১ পেলে ৩৩ করে দেওয়া, ৭৮ পেলে ৮০ করে দেওয়া। তবে চলতি বছরের এসএসসির খাতা বিশ্লেষণ করার জন্য আমরা বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটকে দায়িত্ব দিই। তাদের গবেষণায় শিক্ষকদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক উত্তরে যেখানে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার কথা সেখানে তা দেওয়া হয়নি। আবার হয়তো অল্প লিখেছে তাকে বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে। এ জন্যই এখন থেকে যিনি প্রশ্ন করবেন তিনি উত্তরও তৈরি করবেন। আর খাতা দেওয়ার আগে কর্মশালা করা হবে। সেখানে পরীক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা শেখানো হবে।

সূত্র – কালের কন্ঠ ৮ জানুয়ারি, ২০১৭

No comments ডাহা ভুলে চোখ বুজে নম্বর

মন্তব্য করুণ

Chandpur News On Facebook
দিন পঞ্জিকা
January 2017
S M T W T F S
« Dec    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
বিশেষ ঘোষণা

চাঁদপুর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য,জ্ঞানী ব্যাক্তিত্ব,সাহিত্য নিয়ে আপনার মুল্যবান লেখা জমা দিয়ে আমাদের জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে তুলুন ।আপনাদের মূল্যবান লেখা দিয়ে আমরা গড়ে তুলব আমাদের প্রিয় চাঁদপুরকে নিয়ে একটি ব্লগ ।আপনার মূল্যবান লেখাটি আমাদের ই-মেইল করুন,নিম্নোক্ত ঠিকানায় ।
E-mail: chandpurnews99@gmail.com