সী ফুডের মাছ পচে দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে এলাকায় মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

চাঁদপুর পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ডস্থ মধ্য ইচলী এলাকায় অবস্থিত সী ফুডের হিমাগারে রক্ষিত চিংড়ি মাছগুলো পচে-গলে যাওয়ায় এখন সেখান থেকে শুধু দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। ভয়ানক দুর্গন্ধ আশপাশে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে, সে এলাকায় মানুষ বসবাস করাটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ প্রতিবেদক সেখানে সরজমিনে গিয়েও দেখলেন সে এক দুর্বিষহ অবস্থা। সী ফুডের গেইটের সামনে যাওয়া মাত্র ভেতর থেকে এমন দুর্গন্ধ বের হয়ে আসলো। যেনো বমি আসার উপক্রম হলো। এরপর দ্রুত সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে চলে আসা হয়। অবস্থা দেখে প্রতীয়মান হলো, এমন অবস্থা আরো কিছুদিন থাকলে সেখানে মহামারি দেখা দিতে পারে।

চাঁদপুর থেকে চিংড়ি মাছ রপ্তানীর একটি প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান ছিলো সী ফুড কর্পোরেশন লিমিটেড। এর মালিক ছিলেন আলহাজ্ব শাহীদুর রহমান চৌধুরী। তিনি অনেক বছর যাবৎ বেশ সুনামের সাথেই এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছিলেন। চাঁদপুরের সুধী মহলে তাঁর বেশ সুনাম ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে ২০১৬ সালের এপ্রিলে তিনি দেশ ত্যাগ করে সুদূর আমেরিকায় পাড়ি জমান। যাওয়ার আগে তিনি তাঁর এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মিশন রোডস্থ বাসাসহ সব সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে যান। তিনি বিদেশ চলে যাওয়ার অনেকদিন পর এ বিষয়টি জানাজানি হয়। তখন বের হয়ে আসে ব্যাংক ঋণসহ নানা ঘটনা। তখনই জানা যায়, সী ফুডের নামে সোনালী ব্যাংক চাঁদপুর শাখায় ২০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। সে ঋণ এখন চক্রবৃদ্ধি হারে ৩০ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই ঋণ রেখে শাহীদুর রহমান চৌধুরী তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নতুন মালিকের কাছে বিক্রি করে মালিকানা হস্তান্তর করে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই তিনি দেশ ছাড়েন। জানা গেছে, সোনালী ব্যাংক কুমিল্লার তৎকালীন জিএম আঃ মতিনের মৌখিক অনুমতি নিয়েই শাহীদুর রহমান চৌধুরী বিদেশ চলে যান।

কিন্তু বিধিবাম! ঋণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সী ফুডকে নতুন মালিকের কাছে হস্তান্তর করতে পারছেন না। এভাবেই প্রায় দু’ বছর চলে যাচ্ছে। সী ফুডও এ সময় যাবৎ বন্ধ রয়েছে। এদিকে বকেয়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের দায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় প্রায় ৬/৭ মাস আগে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার কারণে সী ফুডের হিমাগারে থাকা সব মাছে পচন ধরা শুরু করে। ভেতরে মাছ রয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকার মতো। বেশ কিছুদিন যাবৎ এই পচা দুর্গন্ধ প্রকট আকার ধারণ করে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। পাশেই থাকা কোস্টগার্ড স্টেশনের বাসিন্দারাও বেশ দুর্ভোগের মধ্যে আছে।

এই দুর্ভোগের কথা সোনালী ব্যাংক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানালে তারা ব্যাংকের চাঁদপুর শাখাকে নির্দেশ দেন সী ফুড থেকে পচে গলে যাওয়া সব সামগ্রী অপসারণ করে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে রাখতে। প্রায় ৪/৫ মাস আগে এ নির্দেশনা দিলেও তা কার্যকর করছেন না ব্যাংকের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এদের খামখেয়ালিপনায় এখন সে এলাকায় জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক চাঁদপুর শাখার জিএম আঃ মতিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে আমরা হেড অফিসের অর্ডার পেয়েছি। এখন ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হবে। তখন আদালতের নির্দেশনায় অপসারণ করা হবে। এছাড়া আমরা এখন আপাতত সেখানে কেরোসিন, বিস্নচিং পাউডার ও ঔষধ ছিটাচ্ছি। আগামী সপ্তাহের মধ্যে মামলা দায়ের হবে বলে আশা রাখি।

জানা গেছে, শাহীদুর রহমান চৌধুরী তাঁর এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি নারায়ণগঞ্জের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী সঞ্জয় কুমার রায় ও তার স্ত্রী সূচনা রাণী রায়ের কাছে বিক্রি করেন। এ বিক্রির বিষয় ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তা সবাই জানতেন। শাহীদুর রহমান চৌধুরী তখন সঞ্জয় কুমার রায়কে নিয়ে সোনালী ব্যাংক কুমিল্লার তৎকালীন জিএম আঃ মতিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ঋণের বিষয়টিও ফয়সালা করে যান। তখন জিএম শাহীদুর রহমান চৌধুরীকে আশ্বস্তও করেছেন এই বলে যে, ‘অসুবিধা নাই, আপনি চলে যান, নতুন মালিক সঞ্জয় কুমার রায়কে কাগজপত্র দিয়ে দেয়া হবে।’ এ আশ্বাসের উপরই শাহীদুর রহমান চৌধুরী বিদেশ চলে যান। কিন্তু সে থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দু’বছর হয় ব্যাংকের সাথে ওই জটিলতা কাটছে না। ফলে একটি নামকরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি এটি এখন সে এলাকার জনস্বাস্থ্যের জন্যেও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।