মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পে পানির অভাবে দুই বিলের শত একর রোপা ইরি বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম

মতলব উত্তর প্রতিনিধি ॥

দেশের অন্যতম বৃহত্তম চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তরের মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পে পানির অভাবে গোয়াল ভাওর এবং রাঢ়ীকান্দি বিলের প্রায় এক শ’ একর জমির রোপা ইরি বিনষ্টের পথে। ফলে কৃষকরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকালে ওই এলাকার কৃষকরা অবস্থান কর্মসূচী পালন করেন এবং পানি না পাওয়ায় প্রতিবাদ জানান। মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের অবহেলার কারনেই এমন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানান কৃষকরা।

মঙ্গলবার (১০ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, ইরি-বোরো মৌসুমে রোপা ইরি ধান ক্ষেতে এখন ভরপুর পানি থাকার কথা। কিন্তু গোয়াল ভাওর এবং রাঢ়ীকান্দি বিলে পানি তো দূরের কথা, ধান ক্ষেতের মাটি ফেঁটে চৌচির হয়ে পড়ে আছে। সেচ ক্যানেলেও পানি নেই। এ সম্যার মধ্য দিয়ে থোর ফেলার সময় পার হতে চলেছে। ধান গাছ লালচে রং ধারন করে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকছে। এ দৃশ্য দেখে ফুঁসে উঠেছে কৃষকরা। এ অঞ্চলের মানুষ কৃষি নির্ভর। তারা মেঘনা-ধনাগোদা পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির পানি দিয়ে ইরি-বোরো মৌসুমে ধান আবাদ করে থাকে। কিন্তু এবার এই প্রথম পানি সংকটে পড়ে কৃষকরা। গোয়াল ভাওয়ার বিলে প্রায় ৫০-৫৫ একর এবং রাঢ়ীকান্দি বিলের প্রায় ৫০-৬০ একর জমির ধান এখন বিনষ্টের পথে।  তবে কিছু কিছু ক্ষেতে শেলো মেশিন দিয়ে পানি ব্যবহার করতেও দেখা গেছে।

গোয়াল ভাওর গ্রামের কৃষক তৈয়ব আলী প্রধান বলেন, ওয়াপদা পানি না দেওয়ার কারণে আমার এক কানি (৪০ শতাংশ) ক্ষেত মারের পথে। আরো ২০-২৫ দিন আগে থেকেই পানি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ওয়াপদা। এ মৌসুমে আর ধান ঘরে তুলতে পারব না। এর কারনে না খেয়েও দিন পার করা লাগতে পারে। কৃষক জালাল তালুকদার, মনির মিয়াজী, নিজাম তালুকদার, সেরাজল হক ও মুছা প্রধানসহ একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, ওয়াপদার কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারনে আমাদের রোপা ইরি মৌসুম বাতিল হয়ে গেল। এ ধান রোপন করা সহ এ পর্যন্ত অনেক টাকা লেগেছে। শুধু সময়মত পানি না পাওয়ার কারণে আমাদের হাজার হাজার টাকা ক্ষতি হচ্ছে।

রাঢ়ীকান্দি বিলে গিয়েও দেখা যায় একই দৃশ্য। গোয়ালভাওর বিলের মত পানি না পেয়ে নষ্ট হওয়ায় ধান ক্ষেত এখন গো খাদ্য পরিণত হয়েছে। জমি ফেঁটে চৌচির হয়ে গেছে। ফলে ওই বিলের সকল ক্ষেতই এখন বিনষ্টের পথে। রাঢ়াকান্দির কৃষক জসিম সরকার, দর্জি আবুল হোসেন, টিপু সুলতান, জিলানী সরকার ও আফজাল মাস্টারসহ একাধিক কৃষক অভিযোগ করেন, পানি না আসার বিষয়টি ওয়াপদার এসও আব্দুল আজিজকে একাধিকবার জানালেও তিনি কোন তোয়াক্কা করেনি। এমনকি সরেজমিনেও আসেনি।

শাপলা পানি ব্যবস্থাপনা এসোসিয়েশনের (ইউ-২১ ক্যানেল) সিনি: সহ-সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, এবার পানি দিতে গিয়ে কয়েকবার সেচ ক্যানেল ভেঙ্গেছে। এ নিয়ে ডিপার্টমেন্টের সাথে কয়েক দফা তর্ক হয়েছে। তারা ক্যানেল ঠিক করার কথা শুনতেই পারেনা। ক্যানেল ঠিক করাও হয়না। কৃষকরা পানিও পায়না। এতে করে কৃষকরা ফুঁসে উঠে আমাদের মারধর করতে চায়। আমরা কৃষকদের কাছে অসহায়। আমাদের কথা ওয়াপদা কর্তৃপক্ষ বুঝতে চায় না।

সভাপতি আবুল কালাম চুন্নু বলেন, ইউ-২১ ক্যানেল এর তুলনায় টার্ন আউট ৩ ও ৪ ক্যানেল উঁচু। ফলে ইউ-২১ ক্যানেলে সর্বোচ্চ পানি দিলেও টার্ন আউট ক্যানেলে পানি কম উঠে। ফলে জমি পর্যন্ত পানি গিয়ে পৌছতে সমস্যা হচ্ছে। তবে জমির মালিকরা রোটেশন করে নিলে পানি জমি পর্যন্ত পৌছানো সম্ভব। জমিতে পানি পৌছাতে গিয়ে কয়েক বার ইউ-২১ ক্যানেল ভেঙ্গে যায়। ইউ-২১ ক্যানেলে পানি আছে বলে তিনি দাবী করেছেন।

মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের পানি ব্যবহারকারী ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক সরকার মো. আলাউদ্দিন বলেন, ইউ-২১ সেচ ক্যানেলটি ১৯৮৮-৮৯ সালে নির্মিত হয়েছে। ৩০ বছরের পুরোনো ক্যানেলে পরিমান অনুযায়ী পানি ছাড়লেই ক্যানেল ভেঙ্গে যায়। তাই টার্ন আউট ৩ ও ৪ এর শেষ সীমানা পর্যন্ত পানি পৌছাতে সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যথাযথ চেষ্টা করছি।

মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের এসও আব্দুল আজিজ বলেন, টার্ন আউট দিয়ে গোয়াল ভাওর ও রাঢ়ীকান্দি বিলে পানি পৌছাতে হলে ইউ-২১ ক্যানেলে অনেক চাপ পড়ে। কারণ টার্ন আউটের চেয়ে ইউ-২১ ক্যানেল অনেক নিচু। ফলে এ মৌসুমে একই স্থানে ৪ বার ক্যানেল ভেঙ্গেছে। তবে ৪ টি টার্ন আউট ক্যানেলে রোটেশন অনুযায়ী পানি ছাড়লে কৃষক পানি পাবে। আমার জানামতে তারা রোটেশনে পানি নিতে চাচ্ছে না। মঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের পানি ব্যবহারকারী ফেডারেশনের কমিটিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারনেই এসব হচ্ছে বলে তিনি দাবী করেন। এদিকে সাংবাদকর্মীরা এ প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য সরেজমিন থেকে চলে আসার পর ক্যানেলে পানি ছেড়ে বলে খবর পাওয়া গেছে।