বড় দুই দলেই বিরোধ একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী

হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা নিয়ে চাঁদপুর-৫ সংসদীয় আসন। গত ১০টি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে চারটিতে আওয়ামী লীগ, চারটিতে বিএনপি এবং বাকি দুটিতে জাতীয় পার্টি জয় পেয়েছে।

বর্তমানে এই আসনে সংসদ সদস্য হলেন আওয়ামী লীগের মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম (বীর-উত্তম)। একসময়ের ত্যাগী নেতাদের পাশ কাটিয়ে নব্যদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন—দলের ভেতর এমন অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। দলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে দাবি করে সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাট্টা স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন নেতা।

আগামী সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্য ছাড়াও আরো যে সাতজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতেন পারেন তাঁরা হলেন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পেশাজীবী নেতা ইঞ্জিনিয়ার সফিকুর রহমান, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ হোসেন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নুরজাহান বেগম মুক্তা, সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক ফজলুল হক, ক্রীড়া সংগঠক সফিকুল আলম ফিরোজ, হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ মজুমদার ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. মোস্তফা কামাল।

অন্যদিকে বিএনপিতেও চলছে বিভাজনের রাজনীতি। একসময়ের প্রভাবশালী নেতা সাবেক সংসদ সদস্য এম এ মতিনকে সামনে এনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন মূলধারার স্থানীয় নেতারা। অন্যদিকে বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের পক্ষ নিয়েছেন দলের আরেকটি অংশ।

আওয়ামী লীগ : ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম। ওই সময় বেশ কিছুদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপির এম এ মতিনের কাছে হেরে যান তিনি। ২০০৬ সালে এই আসনে আওয়ামী লীগের মহাজোট থেকে মনোনয়ন চান ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান আল্লামা বাহাদুর শাহ। যদিও ওই নির্বাচন পরে পিছিয়ে যায়। ২০০৭ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে দেশের বাইরে চলে যান রফিকুল ইসলাম। দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের টিকিটে ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন তিনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও সংসদ সদস্য হন রফিকুল ইসলাম। বর্তমানে সংসদে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় মেজর (অব.) রফিককে রাজনীতিতে যাঁরা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, প্রথমসারির এমন নেতাদের সঙ্গে এখন তাঁর চরম বিরোধ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে গত কয়েকটি জাতীয় দিবস ও দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করেছেন, বিক্ষুব্ধ এসব নেতারা। অন্যদিকে সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলামও নিজের অনুসারীদের নিয়ে আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করেন।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মূলত শীর্ষ নেতাদের অবমূল্যায়ন, দলের বাইরে অন্যদের প্রাধান্য দেওয়া নিয়ে সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ।

এই বিষয় শাহরাস্তি উপজেলার আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জেলা পরিষদ সদস্য হুমায়ুন কবির মজুমদার বলেন, ‘বিগত দিনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে জামায়াত-বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী হতে সহায়তা করেছেন মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম। এটা করে মুক্তিযুদ্ধের শক্তির ঐক্য বিনষ্ট করেছেন তিনি।’

শাহরাস্তি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র মোশাররফ হোসেন মশু বলেন, ‘সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। শাহরাস্তি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে কুখ্যাত রাজাকার চেরাগ আলীর ছেলে মো. আলী মানিককে আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক করেছেন। এতে প্রমাণিত হয়, সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে দলের ঐক্য ধরে রাখার জন্য আমরা প্রার্থী পরিবর্তন চাই।’

সংসদ সদস্যের বাইরে অন্য সাতজনের মনোনয়ন বিষয়ে কথা হয় হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা হারুনুর রশিদের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁদের মধ্যে যাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে, আমরা তাঁর পক্ষে কাজ করব। কারণ এখানে প্রার্থী পরিবর্তন হলে সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মূল্যায়িত হবে।’

অন্যদিকে শাহরাস্তি উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘এই আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন, একই সঙ্গে মাদক নির্মূলসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ ভালো।’ প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি ওঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বড় দলে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকতেই পারে। তাই বলে পরিবর্তন কেন।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক গাজী মাইনউদ্দিন বলেন, তৃণমূল থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিটি ইউনিট ঐক্যবদ্ধ। তিনি দাবি করেন, ‘যারা পরিবর্তন চায় তারা বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ট।’ তাঁর সাফ কথা—এই আসনে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামের বিকল্প নেই।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান দলের জেলা কমিটির উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার সফিকুর রহমান। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক এই সহসম্পাদক পেশাজীবীদের কেন্দ্রীয় একাধিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাবন্দি আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে এলাকায় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সংগঠিত করে আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত পেশাজীবী এই নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দুর্দিনে অসহায় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশে ছিলাম। এলাকায় দলকে সংগঠিত করাসহ শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি। এই অবস্থায় নৌকা প্রতীক পেয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত হলে হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তির সার্বিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করার আরো সুযোগ পাব।’

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে তিন দশক ধরে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য আমি। এলাকায় সামাজিক কাজের বাইরেও বিদ্যুত্ব্যবস্থার উন্নয়নে অবদান রেখেছি। দল মনোনয়ন দিলে সবাইকে নিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনব।’

বিএনপি : একসময় বিএনপির দুর্গ বলে খ্যাত ছিল চাঁদপুর-৫ হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি আসনটি। দুই উপজেলায় দলের আহ্বায়ক কমিটি প্রতিকূলতার মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হলেন হাজীগঞ্জ মডেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এবং ঐতিহাসিক বড় মসজিদ ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতোয়ালি ড. মো. আলমগীর কবির। অন্যদিকে শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হলেন আখতার হোসেন পাটোয়ারী। তাঁদের নেতৃত্বে এরই মধ্যে বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন পৌর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এম এ মতিন। পরে আবারও ৯১ ও ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি। অবশ্য ৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামের কাছে হেরে যান মতিন। সর্বশেষ ২০০১ সালে আবার সংসদ সদস্য হন তিনি। সব মিলিযে চারবার সংসদ সদস্য হন একসময়ের স্কুল শিক্ষক এম এ মতিন। সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এই ব্যক্তি পরবর্তীতে বিচক্ষণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁকে নিয়ে আবার আসনটি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ।

হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলমগীর কবির বলেন, ‘একটা ক্রান্তিকালে বিএনপির দায়িত্ব নিয়েছি। দলকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত করার জন্য কাজ করেছি। এখন হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত পেলে সবাইকে নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেব।’ আগামী নির্বাচনে প্রার্থী সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে এ এম মতিনের বিকল্প অন্য কোনো প্রার্থী নেই।

আলমগীর হোসেন আরো বলেন, ‘সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি দিয়ে নয়, সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এই আসনে বিএনপির জয় সুনিশ্চিত।’

একই উপজেলার বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক দিদার হোসেন কিসলু বলেন, ‘সরকার ভোটের পরিবেশ ফিরিয়ে দিক। তারপর দেখা যাবে নির্বাচনের মাঠে কে হারে আর কে জেতে।’

এই আসনে বিএনপির আরেক নেতা হেলালউদ্দিন প্রধানিয়া বলেন, ‘দেশে ভোটের রাজনীতি চালু হোক। তখন বোঝা যাবে হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তিতে বিএনপি কত শক্তিশালী।’

শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আখতার হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘এই আসনে বিএনপিতে এম এ মতিনের বিকল্প এখনো অন্য কেউ তৈরি হয়নি। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে প্রমাণিত হবে সাধারণ মানুষের কাছে কত জনপ্রিয় তিনি।’

জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা ইমাম হোসেন বলেন, তাঁর বিশ্বাস আগামী নির্বাচনেও এম এ মতিনকে মনোনয়ন দেবে দলের হাইকমান্ড।

এম এ মতিন বলেন, ‘দল অবশ্যই আমাকে মূল্যায়ন করবে। সেই লক্ষ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ নির্বাচনমুখী হলে, বিপুল ভোটে আবারও নির্বাচিত হব।’

অন্যদিকে এই আসনে বিগত ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হক। যদিও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে হেরে যান তিনি। নির্বাচনের পর তিনি জেলা বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১০ সালে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং বেশ দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে গত ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল। কিন্তু নানা ইস্যুতে জেলা বিএনপি থেকে ছিটকে পড়েন প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার মমিনুল হক। বর্তমানে জেলা পর্যায়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মূহূর্তে বিএনপির রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও মমিনুল হক আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

অন্যান্য দল : এই আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বাধীন এক সময়ের মহাজোটভুক্ত ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান আল্লামা বাহাদুর শাহ। এর আগে ২০০৬ সালে (নির্বাচন হয়নি) মহাজোট থেকে মনোনয়ন লাভও করেন তিনি।

জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চাইবেন হারুন অর রশিদ মুন্সি। এ ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক খোরশেদ আলম খোশু মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। দশম সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। খোরশেদ আলম এরই মধ্যে এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন।