আজ শনিবার, অক্টোবর ২১, ২০১৭ ইং, ৬ কার্তিক ১৪২৪

“বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা প্রদান ও সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ”

Wednesday, October 4, 2017

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গসংস্থা ইউনেসকো ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করার ঘোষণা দিয়েছিল। শিক্ষকদের সম্মান ও স্বীকৃতি জানানোর জন্য বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাংলাদেশ সহ সমগ্র পৃথিবীর সকল শিক্ষককে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হোক “বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা প্রদান ও সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ”
। এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস এমন এক সময় দেশে পালিত হতে চলেছে যখন দেশের সাড়ে পাঁচ লক্ষ এমপিওভুক্ত এবং এক লক্ষাধিক ননএমপিও বেসরকারী শিক্ষকেরা নানাবিধ বঞ্চনার শিকার হয়ে তাঁদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা ও সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নেমে মানববন্ধন সহ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছে । বাংলাদেশ সরকার সব ধরনের শিক্ষকদের নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের আওতাভুক্ত করেছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসার দাবিদার। মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলে ও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো সরকারী, বেসরকারি, মাদ্রাসা ,কারিগরি সহ বহুধা বিভক্ত। সারা দেশের এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে ২% সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বল্প ব্যয়ে পড়াশুনা করছে দেশের পুজিপতি ধনিক শ্রেণীর সন্তানেরা, বাকী ৯৮% বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে সুবিধা বঞ্চিত ,নিন্মবিত্ত , নিন্ম মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক আয়ের জনগোষ্টীর সন্তানেরা যাদের সামর্থ সীমিত অথচ শিক্ষা খাতে ব্যয় অনেক বেশী । এই সব প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে চার কোটির বেশী শিক্ষার্থী। শিক্ষা ব্যবস্থার দুই ধারা সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে এমপিওভুক্ত,নন এমপিওভুক্ত সহ বহুধারায় বিভাজিত সমযোগ্যতার শিক্ষক রয়েছে, তাদের বেতন ভাতায় ও ব্যাপক বৈষম্য বিরাজমান। দিন দিন এ বৈষম্য বেড়েই চলেছে। ২০১৫ সালে ঘোষিত জাতীয় বেতন কাঠামোতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন , বাড়ি ভাড়া ভাতা ১,০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, উৎসব ভাতা মূল বেতনের চারভাগের একভাগ। বৈশাখীভাতা স্বয়ংক্রিয় ভাবে পাওয়ার কথা থাকলেও বেসরকারী শিক্ষকরা এবছর ও বৈশাখীভাতা পায়নি ফলশ্রুতিতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে সাড়ে ৫ লক্ষ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে । এবং জাতীয়করনের একদফা দাবীতে সংগঠিত হতে থাকে সারা দেশের বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীরা।
পক্ষান্তরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, মূল বেতনের ৪৫% বাড়ি ভাড়া, ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, ১০০% উৎসব ভাতা, ২০% বৈশাখী ভাতা ,যাতায়াত ভাতা শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, ভ্রমন ভাতা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ ,আবাসন সুবিধা,পেনশন সহ সরকারের দেয়া সকল সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, এ ছাড়াও কোন সরকারী কর্মকতা/ কর্মচারীর অকাল মৃত্যু হলে আট লক্ষ টাকা এককালীন অনুদান সহ অবসরকালীন প্রাপ্য অন্যান্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা যথারীতি পাবেন।
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত শ্রীলংকা সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মানী প্রদান করা হয়। শিক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব রাষ্ট্রের, যেখানে সরকারী বেসরকারি বিভাজন থাকতে নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ শুধুমাত্র মূল বেতন ও নামমাত্র সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর ও কেন বেসরকারী শিক্ষক সমাজ বৈষম্যের শিকার হবেন? শিক্ষকরা দাবি আদায় করতে রাজপথে নেমেছে বারবার।কিন্তু রাজপথে ও জায়গা হচ্ছে না মানুষ গড়ার কারিগর বেসরকারী শিক্ষকদের ? তাদের কি কোথাও দাঁড়ানোর অধিকার নেই? বেসরকারী শিক্ষকদের সাথে কেন বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে? বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতির জন্য কখনোই ভালো কিছু আশা করা যায় না। বেসরকারি শিক্ষকরা এসব সমস্যার সমাধান দেখেন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র বেতন, পরীক্ষা ফি ও অন্যান্য সূত্র থেকে যাবতীয় আয় জমা পড়বে সরকারি কোষাগারে। সরকারি কোষাগার থেকে মেটাবে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়। বেসরকারি শিক্ষকদের ধারনা, এ পথ ধরে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে সরকারের মোট ব্যয় তেমন বাড়বে না এতে শহর গ্রামের মধ্যে ব্যবধান ঘুচবে এবং শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে ।
গোটা সমাজ দাড়িঁয়ে থাকে শিক্ষার ভিতের ওপর, তাই শিক্ষায় বেশি নজর দেওয়ার অর্থ গোটা সমাজেরই মঙ্গল সাধন। শিক্ষার সামগ্রিক উন্নতি না হলে যে, দেশের উন্নতি হয় না, সে কথা ভুলে গেলে চলবে না আমাদের আইন প্রণেতারা। মনে করিয়ে দিতে চাই, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও নিরক্ষরতা শতভাগ দূর করে উঠতে পারিনি আমরা। পাবলিক পরীক্ষায় পাশের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান দুঃখজনক ভাবে নিন্মগামী। শিক্ষার কাঠামোটাকেই নাড়া দিতে হবে গোড়া থেকে। এখানে প্রয়োজন অর্থের। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনায় আমাদের পরিস্থিতি শোচনীয়। ভারত, শ্রীলংকা, ফিলিপিন্স, পাকিস্থান, উত্তর কোরিয়া ,কিউবা ,বুরুন্ডি ইত্যাদি বেশ কয়েকটি দেশের শিক্ষা খাতে ব্যয় যথেষ্ট সন্তোষজনক এবং শিক্ষা ব্যবস্থা বৈষম্যমুক্ত। বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ও। কিন্তু আমাদের সক্ষমতা থাকা স্বত্বেও শিক্ষাখাতে আশানুরুপ বিনিয়োগ হয়নি, অথচ অর্থনীতিতে অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে পঞ্চম স্থানে বাংলাদেশ। বিশ্বের খুব কম দেশই একটানা এত দীর্ঘ সময় ধরে ৬.৫ শতাংশের উপর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে। অচিরেই প্রবৃদ্ধি ৭.৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, কর্মসৃজন, খাদ্য উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আমদানি ও রফতানি, দারিদ্র্য ও অসমতা হ্রাসসহ আর্থসামাজিক খাতের প্রায় প্রতিটি সূচকেই বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার নির্মাণ, চট্টগামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ ,সারা বাংলাদেশে ১০০ টি অর্থনৈতিক জোন গঠন সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের অভিযাত্রায় ক্রম-অগ্রসরমান। বৈশ্বিক উন্নয়ন সুচকে ও সাত ধাপ এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। এখনি সময় শিক্ষা খাতকে বৈষম্যমুক্ত করে শিক্ষা ব্যবস্থার সব স্তরকে জাতীয়করণের মাধ্যমে এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা গণদাবীতে পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বিরাজমান। যদিও একটি স্বাধীন দেশে কোনোক্রমেই এ ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়, তাই স্বাধীনতা লাভের পর শিক্ষক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বৈষম্যের অবসানকল্পে শিক্ষা ব্যবস্থার সব স্তরকে জাতীয়করণের মাধ্যমে এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নীতিগতভাবে অঙ্গীকার করলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তা ছাড়া ইউনেসকো এবং আইএলওর সদস্যভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষকদের জন্য ১৯৬৬ সালে গৃহীত ‘শিক্ষক সনদ’ থেকে আমাদের শিক্ষক সমাজ বঞ্চিত। শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারী সকল সুযোগ সুবিধার অর্ন্তভুক্ত,পক্ষান্তরে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত, এমপিওবিহীন সহ বহুধারায় বিভাজিত। সমযোগ্যতার শিক্ষকদের বেতন ভাতায় ব্যাপক বৈষম্য বিরাজমান যা কোন ভাবেই কাম্য নয়। দিন দিন এ বৈষম্য বেড়েই চলেছে। এদেশের সাড়ে পাঁচ লক্ষ এমপিওভুক্ত ,এক লক্ষাধিক এমপিওবিহীন বেসরকারি শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি নিবেদন সরকারী বেসরকারি বিভাজন আর নয়,এখনই সময় বৈষম্য দূর করে শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা ফিরিয়ে এনে সুবিধা বঞ্চিত ,নিন্মবিত্ত , নিন্ম মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক আয়ের জনগোষ্টীর সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা।বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে শিক্ষা খাতে যথাযথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব না বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমাদের সাফল্যের সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়বে। শিক্ষাকে প্রতিটি মানুষের অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শহর-গ্রাম,সরকারী-বেসরকারী এমপিওভুক্ত, এমপিওবিহীন শিক্ষক সহ সকল ধরনের বৈষম্য দূর করে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করনের মাধ্যমেই শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান অসমতা নিরসন করা সম্ভব।


শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
মাষ্টার ট্রেইনার,দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প
সেইভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ।
কো-অর্ডিনেটর ও শিক্ষক প্রতিনিধি
আগ্রাবাদ সরকারী কলোনী উচ্চ বিদ্যালয়,চট্টগ্রাম
Email: sumahmud78@gmail.com

No comments “বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা প্রদান ও সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ”

মন্তব্য করুণ

Chandpur News On Facebook
দিন পঞ্জিকা
October 2017
S M T W T F S
« Sep    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
বিশেষ ঘোষণা

চাঁদপুর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য,জ্ঞানী ব্যাক্তিত্ব,সাহিত্য নিয়ে আপনার মুল্যবান লেখা জমা দিয়ে আমাদের জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে তুলুন ।আপনাদের মূল্যবান লেখা দিয়ে আমরা গড়ে তুলব আমাদের প্রিয় চাঁদপুরকে নিয়ে একটি ব্লগ ।আপনার মূল্যবান লেখাটি আমাদের ই-মেইল করুন,নিম্নোক্ত ঠিকানায় ।
E-mail: chandpurnews99@gmail.com