বিভক্ত আ. লীগ-বিএনপি মাঠে সরব

চাঁদপুর-১ (কচুয়া) সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বলছে, এখানে ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শক্তি প্রায় সমান। এ দুটি দলের পরেই ছিল জাতীয় পার্টি। যদিও এখন আর দলটির সেই শক্ত অবস্থান নেই। একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে বড় দুই দলই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। মাঠেও সরব দল দুটির নেতাকর্মীরা। এখন পর্যন্ত দুই দলের টিকিটে নির্বাচন করতে চান এমন চারজনের নাম শোনা যাচ্ছে।

এই আসনে বরাবরই শক্তিশালী প্রার্থীরা নির্বাচন করে আসছেন। তাঁদের কেউ কেউ সরকারের সচিব ছিলেন কিংবা বড় পদে চাকরি করতেন। অবসর নেওয়ার পর যোগ দিয়েছেন রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন খান আলমগীরও সাবেক আমলা। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন চান। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলটির টিকিটে নির্বাচন করতে চান আরেক অবসরপ্রাপ্ত সচিব। তিনি হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. গোলাম হোসেন। তাঁদের ঘিরে কচুয়া আওয়ামী লীগ আদতে দুই ভাগে বিভক্ত। দুইপক্ষই মাঠে সরব। আরেক বড় দল বিএনপিতেও সেই একই অবস্থা। দুইবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার পেশাজীবীদের অন্যতম নেতা প্রকৌশলী দেওয়ান মনিরুজ্জামান মানিককে নিয়ে বিএনপির আরেকটি অংশ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠের রাজনীতিতে সরব।

উল্লেখ্য, চাঁদপুর-১ কচুয়া আসনে বিগত দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে চারবার করে জিতেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী। ১৯৮৬ ও ’৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হন।

আওয়ামী লীগ : সরেজমিন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, কচুয়ায় বিএনপির অনুপস্থিতিতে একক কর্তৃত্ব নিয়ে মাঠের রাজনীতিতে সরব ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু সেখানেও রয়েছে বিভক্তি। সংসদ সদস্য ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠতা লক্ষণীয়। অন্যদিকে, বেশ কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান, উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বড় একটি অংশ সাবেক সচিব মো. গোলাম হোসেনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন খান আলমগীর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। একসময় প্রভাবশালী সচিব ছিলেন ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তাঁর ভাই মেজবাহ উদ্দীন খান আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ’৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে টেকনোক্র্যাট হিসেবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর। প্রতিমন্ত্রী থাকার সময় নিজ নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও জেলায় বেশ উল্লেখযোগ্য উন্নয়নকাজ করেন তিনি। এরপর তো নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর আবার সংসদ সদস্য হন। একাদশ সংসদ নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। এই তথ্য জানিয়ে কচুয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. হেলালউদ্দিন বলেন, এলাকায় সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, বিদ্যুৎসহ ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন মহিউদ্দীন। অসংখ্য বেকারের কর্মসংস্থান করেছেন তিনি। সুতরাং আগামী নির্বাচনে তাঁর বিকল্প অন্য কেউ নেই। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নির্যাতন সহ্য করেও সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের পাশে ছিলেন মহিউদ্দীন খান আলমগীর। তাই আগামী নির্বাচনে তিনিই মনোনয়ন পাচ্ছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন চৌধুরী সোহাগও মনে করছেন মহিউদ্দীন খান আলমগীরের বিকল্প কেউ নেই এখানে। তাঁর দাবি, আগামী নির্বাচনেও বর্তমান সংসদ সদস্য বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।

মনোনয়ন বিষয়ে মহিউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, ‘যেহেতু আমি এলাকার উন্নয়নের সঙ্গে আছি। তাই আমি মনে করি না, এখানে নতুন কাউকে মনোনয়ন দিতে হবে।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে আবারও কচুয়াবাসীর সেবা করতে পারবেন তিনি।

অন্যদিকে, সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই এলাকায় শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা, বেকারদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে জড়িত আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. গোলাম হোসেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে অবসরে আসার পর তিনি এখন সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠজন উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জিয়াউর রহমান হাতেম বলেন, বর্তমানে কচুয়ার রাজনীতিতে নিজ দলের হাতে অনেকেই নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে মো. গোলাম হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে। কারণ, তাঁর হাত ধরেই সুস্থ ও গুণগতমানের রাজনীতি কচুয়ার মাটিতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। নয়তো এখানে অশান্তিই বিরাজ করবে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেন সরকার বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনের সময় আমাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, এখন নিজ দল ক্ষমতায় অথচ একইভাবে স্থানীয় যুবলীগ, ছাত্রলীগ নামধারীদের হাতে নির্যাতনে অতিষ্ঠ আমরা। এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন চাই।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী মো. গোলাম হোসেন বলেন, ‘নৌকা প্রতীক পেলে সব শ্রেণির মানুষের ভোটে বিজয়ী হব। ফলে কচুয়ার মাটি থেকে সন্ত্রাস, মাদক, পেশিশক্তি ও চাঁদাবাজদের নির্মূল করে সুস্থ ধারার রাজনীতি চালু করব। এ জন্য আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে ভালো মনের মানুষদের নিয়ে নতুন করে সংগঠন সাজানোর উদ্যোগ নেব।’ তিনি আরো বলেন, ‘১৯৮০ সাল থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনো চালিয়ে যাচ্ছি। এখন একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে—জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে আরো শক্তিশালী করে নিজ এলাকা ও দেশকে উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে নেওয়া।’

বিএনপি : দ্বিতীয় সংসদ অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে মো. আলফাজ হোসেন, ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে অধ্যক্ষ আবুল হাসনাত, ওই বছরের ১২ জুন ও ২০০১ সালে নির্বাচনে আ ন ম এহসানুল হক মিলন বিজয়ী হন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হন তিনি। ওই সময় পাবলিক পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার ছিলেন মিলন। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা ও জাটকা সংরক্ষণে জোরালো ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে তাঁকে। অনেক সমালোচনা আর আলোচনার মধ্যে তিনি কচুয়ায় স্থাপন করেন চাঁদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

বর্তমানে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তাঁর স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীসহ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গত ৯ বছরে ৩৬টি মামলা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই, হত্যাচেষ্টা, বৃদ্ধাকে ধর্ষণ—এমন অভিযোগে এসব মামলা। তবে মিলনের অনুসারীদের বক্তব্য হলো—রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে হয়রানি করতেই ক্ষমতাসীন দলের লোকজন এসব মামলা করেছে।

দেশের বাইরে মিলনের অবস্থান নিয়ে অনেক কথা শোনা গেলেও তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার রাজীব বলছেন, নির্বাচনী পরিবেশ ফিরে এলে দেশে এসে এহসানুল হক মিলন কচুয়ার রাজনীতিতে অংশ নেবেন।

এদিকে, মিলনের একসময়ের ঘনিষ্ঠজন কচুয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র হুমায়ুন কবির প্রধান ও বিএনপি নেতা শাহজালাল প্রধান এখন আর তাঁর সঙ্গে নেই। বর্তমানে তাঁরা যথাক্রমে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন। তাঁদের সঙ্গে আছেন, বিএনপি সমর্থক কেন্দ্রীয় পেশাজীবী নেতা প্রকৌশলী দেওয়ান মনিরুজ্জামান মানিক। তিনি কচুয়া উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। দলের প্রতীক নিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচন করতে চান তিনি। জাতীয় স্মরণ মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক এই নেতা কয়েক বছর ধরে জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ সরব। শুধু তাই নয়, বিগত সময় ক্ষমতায় থাকার সময় বিএনপির এই পেশাজীবী নেতা মিলনকে টপকে এলাকায় বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ, সড়ক উন্নয়নে কাজ করেন তিনি।

বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির প্রধান বলেন, ‘শত নির্যাতন সহ্য করেও এলাকায় আছি। কিন্তু সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিলন গত দশ বছরে আমাদের খোঁজখবর নেননি। তা ছাড়া বিদেশে অবস্থান করে তিনি দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকের মতো আচরণ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে মিলনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তা হবে দলের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত।’

সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল প্রধান বলেন, ‘দলের দুর্যোগের সময় যাঁরা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, প্রকৃত পক্ষে তাঁরাই আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী দেওয়ান মনিরুজ্জামান মানিক বলেন, ‘এই সরকারের সময় শত জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেও দেশের মাটিতে আছি। ত্যাগী নেতাকর্মীদের পাশে থেকে তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছি। ঢাকায় জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষে পেশাজীবীদের নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছি। তাই সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্র থেকে আমাকেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেবে—এমনটা প্রত্যাশা করছি।’