প্রতিবন্ধী মোরশেদার পাল্টে যাওয়া একজন জয়িতার জীবনের গল্প

আনিছুর রহমান সুজন ঃ
মোরশেদা আক্তার (শারীরিক প্রতিবন্ধী), স্বামী : মজিবুর রহমান, মাতা : জাহানারা বেগম, পিতা : মৃত. আব্দুস ছাত্তার মুন্সী, পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। জন্ম ৫নং গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের ভোটাল মুন্সি বাড়ীতে : ১৫ই জুন ১৯৮০ সালে। ৭ ভাই বোনের মধ্যে মোরশেদা ৫ম ২০০১ইং সালের মে মাসের ১৯ তারিখ মোরশেদা আক্তার বোনের বাড়ী বেড়াতে এসে ধান ভাঙ্গার মেশিন সাথে দুঘর্টনায় বাম হাতের কুনই পর্যন্ত কেটে যায়।

তার পর থেকেই এই সাহসী নারী একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। সকল প্রতিকূলতা জয় করে সে বর্তমানে একজন সফল শিক্ষিকা হয়ে সফলতা অর্জন করেছেন। মোরশেদা আক্তার ১৯৯৭ইং সালে সুবিদপুর হামিদ উল্যা পাটওয়ারী বাড়িতে তার মামার বাড়িতে থেকে বড়গাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি সম্পূর্ণ করেন, ১৯৯৯ইং সালে গল্লাক আর্দশ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচ.এস.সি) সম্পূর্ণ করেন।

পড়ালেখা চলাকালিন সময়ে দূর্ঘনার কবলে পড়ে বাম হাত হারিয়ে পূনরায় পড়ালেখা শুরু করেন। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যান সমিতি (বিপিকেএস) এর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্ব উদ্যোগে সাবলম্বী করন প্রকল্প যাহা বর্তমানে চাঁদপুর (ডিপিওডি) নামে পরিচিত। ঐ সংগঠনের চাঁদপুরের পরিচালক মমতাজ উদ্দিন মিলনের সহযোগীতায় পুনরায় পড়াশুনা শুরু করেন। ২০০৪ইং সালে উপজেলা পর্যায়ে ইন্টার ভিউর মাধ্যমে বেসরকারী বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষীকা হিসেবে নিয়োগ পান।

২০০৭ইং সাল থেকে ২০০৮ইং পর্যন্ত বিভাগীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য পিটিআই কোর্স সমাপ্ত করেন। ২০১১ইং সালে চাঁদপুর সরকারী মহিলা কলেজ কেন্দ্র থেকে উমুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ের মাধ্যমে বিএসএস সমাপ্ত করেন। ২০১৩ইং সালে চাকুরী জাতীয় করন করার কারনে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষীকা হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।

মোরশেদা আক্তারের বক্তব্য ঃ ‘‘প্রতিবন্ধি তাই শেষ কথা নয় নতুন জীবনের সূচনা’’ হল আমার। অনেকে আমাকে নিয়ে আপসোচ করত, অনেক সময় মা সহ পরিবারে অন্য সদস্যদের সমাজ এর লোকজন বলত আর পড়ার দরকার নেই একটা ছেলে দেখে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে। কিন্তু অভিভাবকদের ইচ্ছা থাকলেও স্ব-উদ্যোগে এবং আস্থার মাধ্যমে সকল প্রতিকুলতা দুর করে আজকের অবস্থায় উপনিত হয়েছি। আমার এইচ.এস.সি পরীক্ষার কিছু দিন পূর্বে আমার বাবা ইন্তেকাল করেন।

আমার পরিবারের বিবেচনায় আমাকে অনেক পরিবার বিবাহের জন্য নির্বাজন করত কিন্তু যখনই জানত বা শুনত আমার ১টি হাত নাই অর্থ্যৎ আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তখনই তারা চলে যেত। আমার অনেক দুঃখ হত আমার ভাগ্যে কি লিখা আছে। আমি মনে মনে ভাবতাম যদি কোন ব্যক্তি আমাকে জীবন সঙ্গী করতে আসে আমি অবহেলা করব না। তবে অবশ্যই তার সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা থাকতে হবে। বর্তমানে জীবন সঙ্গী আমার চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল আছে। আল্লাহর নিকট আমি কৃতজ্ঞ।
দায়িত্ব পালনে এবং কঠোর পরিশ্রমি হওয়ায় সকল শিক্ষকরা এবং অফিসার বৃন্দ তাকে সহযোগীতা করেন। ৩০ মার্চ ২০১৭ইং তারিখে হইতে ভাটেরহদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষীকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সংসার জীবনে ২৯ই জুলাই ২০১১ইং সালে রুস্তুমপুর গ্রামের মজিবুর রহমানের সাথে পারিবারিক ভাবে ইসলামের রীতি মোতাবেক বিবাবহ বন্ধনে আবদ্য হয়। তখন মোরশেদা আক্তারের স্বামী মজিবুর রহমান একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মরত ছিলেন। বিয়ের একবছরের মাথায় মোরশেদা আক্তারের ঘর আলো করে একটি কণ্যা সন্তানের জন্ম নেয়। তার নাম মুশরিপা আক্তার বুশরা। কণ্যা সন্তান জন্ম নেওয়ার পূর্বে গ্রামের লোক কিছু কুসংস্কার করত যে, আমি প্রতিবন্ধী আমার সন্তান ও হবে প্রতিবন্ধী আমার স্বামী মজিবুর রহমান এ কুসংস্কারে কখনোই কান দিতেন না,

বরং আমাকে সাহস যোগাতেন। আমি যেন আমার মত সমাজের অবহেলিত সুবিধা বঞ্চিত প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা আতœসামাজিক মান উন্নয়নে কাজ করতে পারি। পাশাপাশি জাতিকে শুশিক্ষিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে পারি।

মোরশেদা আক্তারের স্বামী মজিবুর রহমানের বক্তব্য ঃ
আমার পরিবারের সম্মতি নিয়ে পারিবারিক উদ্যোগে মোরশেদা কে বিবাহ করি। তাকে কখনো হেয় প্রতিপন্য করে কোন ভাষা ব্যবহার করি নাই। বরং সমাজের কাজ করার জন্য আমি তাকে সব সময় উৎসাহ দিয়েছি। ভবিষ্যতে ও করব। তাকে সামাজিক ভাবে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে থাকি। তার যে শারীরিক সমস্যা আছে আমি এই সমস্যাকে কখনো বড় করে দেখেনি।

আমি মনে করি আমার স্ত্রী শিক্ষিত সে আমাকে শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে পারবে। আমার সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিত করে এই সমাজ বিনিমির্মানে অবদান রাখবে এবং সমাজকে নিয়ন্ত্রন করবে এই আমার আশা। সকলের নিকট আমার এই দোয়া চাওয়া যেন সন্তান ও পরিবার নিয়ে সুন্থ্য ভাবে সমাজে বেঁচে থাকতে পারি।

মোরশেদা আক্তারের মা জাহানারা বেগমের বক্তব্য ঃ
আমার মেয়ে মোরশেদা আক্তার প্রতিবন্ধী হওয়ার পর তাকে আমরা কখনও আলাদা চোখে দেখেনি। প্রতিবন্ধী হওয়ার (হাত হারানোর পর) তার জন্য কোন প্রকার বাড়তি কিছু করতে হয়নি। আমাকে অনেকেই বলেছে প্রতিবন্ধী মেয়ে আর পড়ালেখার প্রয়োজন নেই, বিয়ে দিয়ে দাও।

আমি বলতাম আমার মেয়ে কারো করুনা বা বোঝা না হয়ে নিজের পায়ে দাঁিড়য়ে তার পর যাহা করার দরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে তা করবে। সে তার নিজ চেষ্টায় এবং তাদের সংগঠনের চেষ্টায় আজ সমাজে পরিচিত। আমি তার আরো উন্নতি দেখতে চাই এবং দোয়া করি যেন সে সমাজের জন্য ভাল কিছু করে যেতে পারে। স্বামী সন্তান নিয়ে ভাল ভাবে সমাজে এবং চাকুরী ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী হয়ে সাধারন মানুষের মত মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারে।