দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ সফলভাবে কক্ষপথে

থ্রি, টু, ওয়ান, জিরো (৩, ২, ১, ০)। যাত্রা শুরু করল দেশের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’। ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান লেখা স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে গত রাতে স্যাটেলাইট অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার বিকেল ৪টা ১৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ২টা ১৪ মিনিট) ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড থেকে স্যাটেলাইটটির সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়। যোগাযোগ ও সম্প্রচারের এই স্যাটেলাইটটি নিয়ে মহাকাশে রওনা হয় যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কম্পানি স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেট। উৎক্ষেপণের আনুমানিক ৩৩ মিনিট পর স্যাটেলাইটটি বহনকারী রকেট কক্ষপথে প্রবেশ করে।

স্যাটেলাইটটির বিস্তৃতি হবে বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া থেকে তাজিকিস্তান পর্যন্ত। পদ্মা সেতুর পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দেশবাসীর জন্য দ্বিতীয় গর্বের বিষয়।

স্যাটেলাইটটির উেপক্ষপণ দৃশ্য স্পেসএক্স সরাসরি তাদের ওয়েবসাইটে সম্প্রচার করে। রাত জেগে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বড় পর্দার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ক্ষণের সাক্ষী হয়েছে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ জেলা প্রশাসনগুলোর আয়োজনে এই উৎক্ষেপণ দৃশ্য দেখানো হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বহু বাংলাদেশিও এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সরাসরি সম্প্রচার প্রত্যক্ষ করে।

‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিভিশন ভাষণে এর শুভ উৎক্ষেপণ ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তাঁর তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ফ্লোরিডায় এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষ করে। ফ্লোরিডার স্বচ্ছ আকাশে প্রায় ৭ মিনিট স্যাটেলাইটটি দেখা যায়।

ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষকারী আইসিটি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, ‘আমি আজকের দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করতে চাই, যিনি ১৯৭৪ সালে দেশের সর্বপ্রথম স্যাটেলাইট আর্থ স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে মহাকাশ যুগে প্রবেশের কার্যক্রমের সূচনা করেন।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রযুক্তিকেন্দ্রিক উত্তরণের দৃষ্টান্ত।

প্রতিমন্ত্রী পলক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু-১ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সময়োপযোগী উদ্যোগও, যার ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিশন রয়েছে।’

এর আগে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছিলেন, বহনকারী রকেট বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটকে মহাকাশে বাংলাদেশের ভাড়া নেওয়া অরবিটাল স্লট ১১৯.৯ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে যাবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফ্রান্সের থ্যালেস এলেনিয়া স্পেসের তৈরি স্যাটেলাইটটির ওজন জ্বালানিসহ তিন হাজার ৭০০ কেজি। স্যাটেলাইটটির জন্য নির্ধারিত কক্ষপথ ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে। এয়ার ট্রাফিকের কারণে কক্ষপথের ওই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে আট থেকে ১২ দিন সময় লাগবে। এরপর স্যাটেলাইটটি বাংলাদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত দুটি গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযাগ করতে সক্ষম হবে। বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যেতে আরো তিন মাস সময় লাগতে পারে।

স্যাটেলাইটটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কম্পানি লিমিটেড নামে একটি কম্পানি গঠন করা হয়েছে। কম্পানির বর্তমান জনবল ১৮ জন প্রকৌশলীসহ ৩৫ জনের মতো। ভূমি থেকে উপগ্রহটি নিয়ন্ত্রণের জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর এবং রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) নিজস্ব জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি ‘গ্রাউন্ড স্টেশন’।

বঙ্গবন্ধু-১ একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট। এর জন্য ব্যয় হচ্ছে দুই হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্যাটেলাইটটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মেয়াদ ১৫ বছর।

এই স্যাটেলাইট থেকে দেশ কী ধরনের সেবা পাবে সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এতে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে, যার ১৪টি সি এবং ২৬টি কেইউ ব্যান্ডের। ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া হবে। এই স্যাটেলাইটে বিদেশনির্ভরতা কমবে। বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রতিবছর এক কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ হয়। নিজস্ব স্যাটেলাইট হলে এ টাকা দেশেই থাকবে।

এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্প্রচারভিত্তিক সেবা প্রসার সহজতর হবে। বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে অবসান হবে পরনির্ভরশীলতার। ডিটিএইচ, ভিডিও ট্রান্সমিশন, ভি-স্যাট, প্রাইভেট নেটওয়ার্ক, পয়েন্ট টু পয়েন্ট কানেকশন—এসব সেবা সহজ হবে। প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্বের অভিজাত দেশগুলোয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তিনটি ক্যাটাগরিতে সেবা দেবে। ব্রডকাস্টিং, টেলিকমিউনিকেশন ও ডাটা কমিউনিকেশন সেবা দিয়ে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি করবে।’

এর আগে ফ্লোরিডার স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ৩টা ৪৭ মিনিট) স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের আয়োজন করা হয়েছিল। স্যাটেলাইটটি রকেটে স্থাপন ও জ্বালানি ভরাসহ সব প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। উৎক্ষেপণের ওই নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে ধোঁয়াও ছাড়তে শুরু করেছিল ফ্যালকন-৯। কিন্তু শেষ মিনিটে এসে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎক্ষেপণ স্থগিত করা হয়।

গত বৃহস্পতিবারই স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ১২ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটের (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিট) মধ্যে যেকোনো সময় স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করার কথা ছিল। একপর্যায়ে স্পেসএক্স স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ২টা ৪২ মিনিট) উৎক্ষেপণ সময় নির্ধারণ করে। পরে এক ঘণ্টা পিছিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ৩টা ৪৭ মিনিট) উৎক্ষেপণের সময় জানানো হয়েছিল। কিন্তু ওই রাতেও অপেক্ষার অবসান হয়নি।

ওই দিন উৎক্ষেপণ স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁর ফেসবুকে লেখেন, ‘উৎক্ষেপণের শেষ মুহূর্তগুলো কম্পিউটার দ্বারা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। হিসাবে যদি একটুও এদিক-সেদিক পাওয়া যায়, তাহলে কম্পিউটার উৎক্ষেপণ থেকে বিরত থাকে।’

স্পেসএক্স সব কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শুক্রবার আবার এই স্যাটেলাইট বহনকারী রকেটটি উৎক্ষেপণের চেষ্টা চালাবে জানিয়ে জয় লেখেন, ‘যেহেতু এ ধরণের বিষয়ে কোনো ঝুঁকি নেওয়া যায় না, সেহেতু উৎক্ষেপণের মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষা করা খুবই সাধারণ বিষয়, চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।’

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের দুর্লভ মুহূর্তটি সরাসরি সম্প্রচার ব্যবস্থা থেকে বড় পর্দায় দেশবাসীকে দেখাতে গত বৃহস্পতিবার রাতের জন্য দেশের সব জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতি যে নির্দেশ ছিল, তা গত রাতেও বহাল রাখা হয়। এ বিষয়ে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, মেহেরপুর পৌরসভার কমিউনিটি সেন্টারে এবং জেলা প্রশাসকসহ উপজেলা পরিষদের কার্যালয়েও অনুরূপ ব্যবস্থা বৃহস্পতিবারের মতো আজ রাতেও রয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রগুলোতেও এ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

এ ছাড়া গতকাল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ ফ্লোরিডার হোটেল থেকে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, রকেট ও স্যাটেলাইটে কোনো সমস্যা নেই। তবে গ্রাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা (লঞ্চ প্যাড) হতে পারে।

বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কম্পানি লিমিটেডের এক কর্মকর্তা গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, রকেট উৎক্ষেপণের আগে ৩০টি পয়েন্ট পরীক্ষা করা হয়। কম্পিউটারের মাধ্যমে এ পরীক্ষায় প্রতিটি পয়েন্টে গ্রিন সিগন্যাল পেলে তবেই উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কোনো একটি পয়েন্টে গ্রিন সিগন্যাল না পেলে পুনরায় সার্বিক বিষয়টি পুনঃপরীক্ষার আওতায় চলে যায়। এটি খুব সামান্য ত্রুটির কারণেও হতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে এর আগে উৎক্ষেপণ করা ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’র প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খলিলুর রহমান বঙ্গবন্ধু-১-এর উৎক্ষেপণে বিলম্ব বিষয়ে গতকাল রাত সোয়া ৮টায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রযুক্তিগত বিষয়ে কোনো সমস্যা যেকোনো সময় হতেই পারে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমার ধারণা, আজ রাতেই আমাদের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।’ তিনি জানান, তাঁদের ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’র উৎক্ষেপণের তারিখ নির্ধারিত ছিল গত বছরের ২ জুন। পরে এটি ৪ জুন উৎক্ষেপণ করা হয়।

যত দিন থেকে অপেক্ষা : দেশের নিজস্ব এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য অপেক্ষা চলছে প্রায় এক বছর ধরে। গত বছর এপ্রিলে ধারণা দেওয়া হয়, ‘বঙ্গবন্ধু-১’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ হতে যাচ্ছে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই। ওই বছরের ১৭ এপ্রিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের তখনকার প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের রেপ্লিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করার পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা ১৬ ডিসেম্বরের আগেই সম্ভাব্য চারটি তারিখ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাব পাঠাব। তিনি যে তারিখ নির্ধারণ করে দেবেন সেই তারিখেই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে।’

এরপর গত মার্চে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্পের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মেজবাহউজ্জামান বলেন, ফ্রান্স থেকে স্যাটেলাইটটি ফ্লোরিডার কেইপ ক্যানাভেরালে যেকোনো সময় নিয়ে যাওয়া হতে পারে। এরপর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা রয়েছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসারও অনুমোদনের প্রয়োজন। এরপর স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানোর তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

পরে গত ৩ এপ্রিল নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে এটি উৎক্ষেপণ হবে।

এদিকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ হতে পারে ধরে নিয়ে দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাঠাতে ২৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের জন্য গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ও ৫ মার্চ দুটি সরকারি আদেশ জারি হয়। এ আদেশে মার্চের শেষ সপ্তাহ বা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যাওয়া-আসার সময় বাদে চার দিনের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়।

গত ২৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট ফ্রান্সের অ্যানতোনোভ নাইস বিমানবন্দর থেকে একটি কার্গো বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় এর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের বরাতে জানানো হয়, এই স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ হতে পারে ২৪ এপ্রিল।

এরপর ‘স্পেসএক্স’ স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য তারিখ জানায় ৩০ এপ্রিল। ওই তারিখ আবারও পাল্টে ৪ মে নির্ধারণ করা হয়; কিন্তু সেটা ঠিক থাকেনি। গত ২৫ এপ্রিল ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট : সম্ভাবনার মহাকাশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানান, ৭ মে রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ হতে যাচ্ছে। এর কয়েক দিন পর তিনি জানান, ৭ মে নয়, ১০ মে এটি উৎক্ষেপণ হবে।

১০ বছরের প্রচেষ্টা : দেশের প্রথম এই যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইটের বিষয়ে বিটিআরসি ২০০৮ সালের এপ্রিলে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ২০১০ সালে পুনর্গঠন করা হয়। এরপর তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে ২০১০ সালে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) আহ্বান করা হয়। এতে সাড়া দেয় বিভিন্ন দেশের ৩১টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হলে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দাখিল করে। এরপর ‘সরকারি ক্রয় নীতি (পিপিআর)-২০০৮’ অনুসরণ করে ওই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন শেষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিআই) যথাযথ প্রতিষ্ঠান বিবেচিত হয়। এসপিআইয়ের কাজ হচ্ছে উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য বাজার পর্যবেক্ষণ, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আইটিইউয়ের সঙ্গে তরঙ্গ সমন্বয়, স্যাটেলাইট সার্ভিস ডিজাইন, স্যাটেলাইট আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, সিস্টেম ডিজাইন, দরপত্র প্রস্তুত, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সুষ্ঠুভাবে উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ। এ ছাড়া জনবল তৈরিতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া। ২০১২ সালের ২৯ মার্চ এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রুস ক্রাসলসকি তাঁদের সঙ্গে বিটিআরসির চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, এ স্যাটেলাইট  উৎক্ষেপণ করার পর বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করতে পারবে।

এদিকে বিটিআরসির কর্মকর্তাদের অনেকেরই ধারণা, বাংলাদেশ আইটিইউ থেকে নিজস্ব অরবিটাল লোকেশন ও প্রয়োজনীয় ফ্রিকোয়েন্সি পায়নি। এ ছাড়া প্রক্রিয়াটিও অনেক জটিল। এ কারণেই রাশিয়া থেকে অরবিটাল পজিশন ভাড়া নিতে হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিটিআরসির ১৪৭তম সভায় এ বিষয়  বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়।

সভায় জানানো হয়, আইটিইউ থেকে নিজস্ব অরবিটাল লোকেশন ও প্রয়োজনীয় ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার বিষয়। এ কারণে যথাসময়ে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিশ্চিত করার জন্য বিটিআরসির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল  (এসপিআই) অন্য কোথাও থেকে অরবিটাল পজিশন ভাড়া বা কেনার পরামর্শ দেয়।

এসপিআই জানায়, রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্পুটনিক তাদের মালিকানাধীন অরবিটাল লোকেশন ১১৯ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে ইন্টারস্পুটনিক বাংলাদেশকে এসপিআইয়ের মাধ্যমে এই তাগাদা দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বড়মাপের স্যাটেলাইট অপারেটর তাদের ওই অরবিটাল পজিশন ভাড়া বা কিনে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। এরপর এ স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে ১৫ বছরের জন্য ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্লট কেনে বাংলাদেশ। এ জন্য খরচ হয় ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের থ্যালেস এলেনিয়া স্পেসের সঙ্গে বিটিআরসির বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট  বিষয়ে মূল কাজ শুরুর চুক্তি সই হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও ঋণের ব্যবস্থা করে ফ্রান্সের ওই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

বিটিআরসি সূত্র জানায়, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশনস ইউনিয়ন বা আইটিইউতে বাংলাদেশের  নিজস্ব অরবিটাল পজিশন ৬৯ ডিগ্রি ও ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে পাওয়ার জন্য ২০০৭ সালে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল, জাপান, সাইপ্রাস, আর্মেনিয়া ও উজবেকিস্তান তাতে আপত্তি জানায়। প্রক্রিয়াগত কারণে এ ধরনের আপত্তি অস্বাভাবিকও নয়। দেনদরবার এখনো চলছে। কিন্তু অনিশ্চয়তার মধ্যে না থেকে দ্রুত ইন্টারস্পুটনিকের সঙ্গে সমঝোতায় আসা হয়।