ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন করে ভিডিও চিত্র ধারণ নির্যাতিতাকেই উল্টো টিসি দিয়ে দিলো কর্তৃপক্ষ

হাইমচর প্রতিনিধি-
imama-master.jpg11ঢাকার আলোচিত লম্পট শিক্ষক পরিমলের মতো ছাত্রীর সাথে অবৈধভাবে যৌন সম্পর্ক গড়ার অভিযোগ উঠেছে হাইমচরের চরভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে। প্রাইভেট ও কোচিং পড়ানোর সুযোগে প্রলোভন ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে ছাত্রীদের সাথে যৌন সম্পর্ক তৈরির অভিযোগ করায় উল্টো ওই শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও এলাকার প্রভাবশালীরা শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অভিযোগ না করার শর্তে অভিভাবকের মুচলেকা রেখে বিদ্যালয় থেকে মেধাবী ওই ছাত্রীকে টিসি বা ছাড়পত্র দিয়ে বহিষ্কার করেছে।

এ ব্যাপারে হাইমচর উপজেলা উচ্চ মাধ্যামিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মো’তাসিম বিলস্নাহের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনাটি আমি আরো আগেই নির্যাতিতা ছাত্রীর বোনের কাছ থেকে শুনেছি। তারা নিরাপত্তা ও লোক লজ্জার ভয়ে লিখিত অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছে। কিন্তু লিখিত অভিযোগ ছাড়া এ ধরনের ঘটনার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। অভিযুক্ত শিৰক ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই imam-master.jpg225555তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ইমাম হোসেন হাইমচরের চরভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিতের সহকারী শিক্ষক। তিনি স্কুলের ছাত্রাবাসে থাকেন এবং সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়ান। প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগে তিনি বেশকিছু ছাত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলেন। শুধু তাই নয়, গোপন ভিডিও ক্যামেরায় এসব অশস্নীল দৃশ্যের ভিডিও চিত্র ধারণ করে তার ব্যক্তিগত কম্পিউটারে রেখে দেন।

জানা যায়, ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক শাহানাজ টেলু একটি তথ্য প্রিন্ট করার জন্য সহকর্মী ইমাম হোসেনের কম্পিউটার ব্যবহার করতে গিয়ে তার গোপন ভিডিও ক্যামেরায় ধারণকৃত অশস্নীল ভিডিও চিত্রগুলো দেখে ফেলে। পরে তিনি বিষয়টি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্কুল পরিচালনা কমিটির কর্মকর্তাদের জানান। লম্পট শিক্ষক এসব শুনতে পেরে সবার হাতে-পায়ে ধরে বিষয়টির সমাধান করে ফেলেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে কিছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উত্তেজিত হয়ে উঠে। লম্পট শিক্ষকের বিচার ও শাসত্দির দাবিতে বেশ কিছু শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন নিয়ে যায়। কিন্তু প্রধান শিৰক সেই আবেদন গ্রহণ করেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চরভাঙ্গা স্কুলের দু’ শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের জানায়, আমরা ইমাম স্যারের বিচার ও শাসত্দির দাবিতে দরখাসত্দ জমা দেয়ার পর থেকে স্কুলের তিন-চারজন শিক্ষক বিনা কারণে আমাদেরকে বেত্রাঘাত করে। আমরা কখনও ইমাম স্যারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারিনি। তারা জানায়, শিক্ষকরা সব সময় তাদের চাপের মুখে রাখেন। যে কারণে তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেনি ।

সমপ্রতি ভিডিও ক্লিপস আকারে এলাকার যুবকদের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছে লম্পট শিক্ষকের গোপন ভিডিও ক্যামেরায় ধারণকৃত ছাত্রীর সাথে অশস্নীল ভিডিও চিত্র। লম্পট শিক্ষক ইমাম হোসেনের যৌন নির্যাতনের শিকার ছাত্রীর বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (নাম প্রকাশ করা হলো না) জানান, আমার মেধাবী মেয়েকে শিক্ষক ইমাম জোর করে এ কাজ করাতে বাধ্য করেছে। এ ঘটনার পর সালিসের মাধ্যমে কমিটি ও প্রভাবশালীরা আমার মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে টিসি দিয়ে দেয়। আমি মেয়েকে এখন পার্শ্ববর্তী এমজেএস হাই স্কুলে ভর্তি করেছি। তিনি বলেন, লম্পট শিক্ষক ইমাম অগণিত মেয়ের সর্বনাশ করেছে।

ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেননি এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ ইমাম হোসেন খুব প্রভাবশালী লোক। আমাদের মানসম্মানের কথা ভেবেই মামলা করিনি। তিনি বলেন, আমার জীবনের নিরাপত্তা আপনারা দিতে পারলে আমি মামলা করবো। কারণ, আমি প্রতিমাসে ৪-৫দিন হাইমচর উপজেলা হেডকোয়ার্টারে যাতায়াত করি। আমি যদি ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করি তাহলে তার লোকজন আমাকে মেরে ফেলবে। আমরা এমনিতেই সংখ্যালঘু। তিনি আরও বলেন, টাকার জোরে লম্পট শিক্ষক সবাইকে হাত করে নিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলের পাশের অপর এক ব্যক্তি জানান, তার ২টি ভাগি্ন এ স্কুলে পড়ে। আমি তাদেরকে এ স্কুল থেকে নিয়ে যাবো। লম্পট শিক্ষক তাদের যে ক্ষতি করবে না এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।

এ ব্যাপারে চরভাঙ্গা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রণব কুমারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং লম্পট শিক্ষক ইমাম হোসেনের গুণগান করে জানান, চলতি বছরের ৩০ মার্চ করা ছাত্রীর বাবার লিখিত আবেদনের প্রেৰিতে ওই ছাত্রীকে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়া হয়েছে।

সালিসে উপস্থিত এক যুবক ও ইমাম হোসেন বিএসসি’র এক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্যারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনায় ওই ছাত্রীকে বিদ্যালয় থেকে টিসি দিয়ে দেয়া হয়।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুর রহমান এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করে জানান, তার কাছে কেহ কোনো অভিযোগ করেনি। ছবি বা ভিডিওর বিষয়ে তিনি খোঁজ-খবর নেবেন বলে জানান।

চরভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইসমাইল হোসেনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, এ রকম কোনো ঘটনা এই স্কুলে ঘটেনি। পরবর্তীতে এক পর্যায়ে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন এবং বলেন, আপনারা যা জানেন আমিও তাই জানি। আমি এ ব্যাপারে কোনো মনত্দব্য করতে চাই না। তবে এতটুকু বলতে পারি ঘটনাটি সত্য। এ ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসা না করে অন্য শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করুন ।

এ ঘটনার উদ্ঘাটনকারী ওই স্কুলেরই অপর শিক্ষক শাহানাজ টেলুকে জিজ্ঞাসা করা হলে ঘটনাটি সত্য বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, আমি ভিডিও ফুটেজগুলো দেখে সাথে সাথে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ঘটনাটি অবহিত করি এবং প্রধান শিক্ষক ঘটনাটি স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানায়। স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনে তদনত্দ সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু কর্তৃপৰ অদ্যাবধি আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এ ব্যাপারে হাইমচর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মনিরুজ্জামানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কেহ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে ।

এলাকাবাসীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী জানায়, শিক্ষক ইমাম হোসেন এ পর্যনত্দ ১০-১২টি মেয়ের সর্বনাশ করেছে। তারপরও খুঁটির জোরের কারণে আজও তার বিরুদ্ধে কোনো শাসত্দিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

শিক্ষক ইমাম হোসেন এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। ছাত্র-ছাত্রী, এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের অভিযোগ চাঁদপুরে আরেক পরিমলের জন্ম হয়েছে। আমরা চাই এ পরিমলের কঠিন শাসত্দি হোক।