চাঁদপুরে ৩ শতাধিক ঋষি (মুচি) পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা

71
শওকত আলী :
চাঁদপুরে ৩ শতাধিক ঋষি (মুচি) পরিবারকে তাদের পূর্ব পুরুষের বসবাসকৃত ভিটা থেকে অবৈধ ভাবে উচ্ছেদের চেষ্টা চালাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। ৩ শতাধিক পরিবারের লোকজন বর্তমান সরকারে নিকট রাষ্ট্রীয় সকল সহযোগিতা কামনা করছে। তাদের সন্তানরা এদেশে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করলেও সরকারী চাকুরী জুটছেনা তাদের কপালে। এসব পরিবারের লোকজন শিক্ষা অজর্ন করেও মুচির কাজ করে যাচ্ছে।
সরোজমিনে চাঁদপুর শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত নতুন বাজার সিএসডি গোডাউনের পিছনে ঋষি (মুচি পাড়ায়) কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, এখানে প্রায় ৩ শতাধিক লোকের বসবাস। এরা দীর্ঘ প্রায় ২শ’ বছর যাবত এখানে বসবাস করে আসছে। ব্রিটিশ শাসনের সময় প্রথমে তারা ভারত বর্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় ভাবে এখানে আনা হয়, এদেশের মানুষের সেবার জন্য। তাদের পূর্ব পুরুষরা এখানে বসবাস করার অধিকারে তারাও বসবাস করে যাচ্ছে। সে অধিকারে তারা এখানে স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই বর্তমান প্রজন্মের লোকজন জন্ম সূত্রে এ জায়গার মালিক। তাদের নামে নতুন বাজার এলাকায় ১৫শতাংশ জায়গা আরএস, বিএস মূলে রেকর্ড করে দেয় সরকার। মুচি স¤প্রদায়ের নেতা নারায়ন রবি দাস সহ অনেকে এ প্রতিনিধিকে জানান, তারা তাদের সন্তানদের নিয়ে কোন রকম অতি কষ্ট করে দিন মজুরের মত কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছে। শহরের প্রভাবশালী এক ব্যক্তি তার পূর্ব পুরুষের জায়গা দাবি করে ভূয়া কাগজ পত্র তৈরি করে তাদেরকে অন্যায় ভাবে এখানে থেকে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছে। শহরে জায়গার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি চক্র এ ধরনের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। গত ৩ বছর পূর্বে তাদের এখানে বসবাস রত শেষ পুরুষ লশমন (লক্ষণ) ১শ ২৫ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। আর তাতে বুঝা যায় তারা ২শ বছর যাবত এখানে বসবাসরত অবস্থায় রয়েছে। তারা এদেশের বৈধ নাগরিক হওয়া সত্বেও তাদের জন্য চাঁদপুর পৌর সভা ও কোন সংস্থা থেকে কখনো কোনো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কেউ আসেনি সাহায্য দিতে। তাদের বৈধ কাগজ দিয়ে তারা বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সংযোগ এনে ব্যবহার করছে এবং সেই বিল পরিষদ করে যাচ্ছে সরকারকে। তারা অনেকে অভিযোগ করে জানান, আমাদের পাশ্ববর্তী বন্ধুদেশ ভারতে মুচিদের জুতার কাজের জন্য সরকার থেকে জুতার মেশিন, সেলাই মেশিন, ফর্মা ই¯েপ্র মেশিন, বব মেশিন দিয়ে থাকে বিনা মূল্যে। এ ছাড়া সরকার ১লক্ষ টাকা বিনা সুদে পুজি হিসাবে তাদেরকে ব্যবসার জন্য সহযোগিতা করে থাকে। আমাদের বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সময় এ ধরনের আইন পাশ হলেও পরবর্তীতে কার্যকরী অবস্থায় গিয়ে পৌঁছতে পারেনি সে আইন। ভারতে মুচিদের জন্য রেশন হিসাবে চাউল, ডাল, চিনি, সাবান, কেরোসিন তৈল সহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র ন্যয্য মূল্যে দিয়ে থাকে। এক সময়ে ভারতের মুচিরা (ঋষিরা) মারাত্মক সমস্যায় ছিল। এখন তারা সরকারী সহযোগিতা পেয়ে বাংলাদেশের মুচিদের চাইতে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এদেশে মুচিরা (ঋষি) সরকারের সহযোগিতা পেলে তারা এ কাজ করে স্বাবলম্বী হতে পারবে বলে তাদের বিশ্বাস। বর্তমানে তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে ফুটপাতে বসে জুতা সেলাই ও বিভিন্ন সেলাই কাজ করে ২শ টাকা থেকে আড়াইশ টাকা উর্পাজন করে থাকে। এতে তাদের সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয়। অপরদিকে বর্তমান বৃষ্টি ও বর্ষার মৌসুমে ফুটপাতে বসে কাজ করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়। কোনদিন ১শ, দেড়শ টাকা উর্পাজন করে আবার কোন দিন শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। কিন্তু বর্তমান দ্রব্য মুল্যের বাজারে তারা সরকারের কাছে তাদের জন্য সাহায্যের তহবিল গঠন করার জন্য জোর দাবী জানিয়েছে। তারা বলেন প্রতিদিন যে টাকা উর্পাজন হয় তা দিয়ে সংসার চালিয়ে আবার সন্তানদের লেখা পড়া করানো অনেক কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাদের ছেলে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য কলেজ, হাইস্কুল ও প্রাইমারী স্কুলে লেখা পড়া করে জ্ঞান অর্জন করলেও তাদের জন্য পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বর্ডার গার্ডের চাকুরি চেয়েও তারা চাকুরী পায় না। তাদের দাবী সরকারি কোঠায় তাদের জন্য ২% চাকুরীর ব্যবস্থা বিট্রিশ আমল থেকে থাকলেও বর্তমান স্বাধীন দেশে তাদেরকে সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তারা আরো জানায়, চাঁদপুর পৌর সভায় তাদের ২টি চাকুরীর কোঠা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে থাকলেও বর্তমান মেয়র তাদেরকে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। তাদের অভিযোগ শিক্ষা অর্জন করে আমাদের সন্তানরা চাকুরী না পেয়ে বাধ্য হয়ে মুচির কাজ করতে হয়। ভারতে তাদের এ সম্প্রদায়ের ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য ৬শ টাকা থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত শিক্ষা ভাতা দেওয়া হয়। তারা যেখানে যায় সেখানেই অবহেলিত হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা তাদের দূর্ভোগের চিত্র তুলে নিয়ে পত্রিকায় লেখা লেখি করলেও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। তাই তারা বলতে থাকে কত জন এসে আমাদের কথা লিখে নিল, কিন্তু আমরা কিছুই পেলাম না। বর্তমান বাসস্থান থেকে আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে। এখান থেকে উচ্ছেদ করা হলে আমরা কোথায় গিয়ে ঠাই নিব? এ ব্যাপারে মুচি (ঋষি) পাড়ার রমেস চন্দ্র রবি দাস (৪৫) এর সাথে কথা হলে সে বলেন, ৩ ছেলে স্ত্রী নিয়ে আমার ৫ জনের সংসার, ১ ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, বড় ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা শেষ করে অন্যের দোকানে কাজ করে, ছোট ছেলে প্রাইমারী স্কুলে পড়ে। কার্তিক চন্দ্র রবি দাস (৫৫) জানান, ৫ সন্তান নিয়ে ৭জনের সংসার আমার ৩ ছেলে পড়াশুনা করে, দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে এসএসসি পাশ করে, লেখাপড়ার খরচ চালাতে না পারায় কলেজে পড়াতে পারছিনা। অপর মেয়ে ১০ম শ্রেণিতে ও ১ ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশুনা করে এখন অন্যের দোকানে কাজ করে। অপর ছেলে ৭ম শ্রেণিতে পড়ে। রতন চন্দ্র রবি দাস (৩০) ১ সন্তান সহ তার ৩ জনের সংসার। তার মধ্যে বৃদ্ধ ‘মা’ শ্রী মতি খুশি বালা রবি দাস (৭৫) তার সাথে বসবাস করে। এ সংসার চালাতে গিয়ে সে রীতি মত ঋনগ্রস্ত হয়ে গেছে। তারা জানান, আশা ও ব্র্যাক সংস্থা থেকে লোন নিয়ে ঘর ঠিক করে কোন মতে দিন যাপন করছি। প্রতি সপ্তাহে কিস্তির টাকা চালাতে গিয়ে তারা দিশে হারা হয়ে পড়ে। নির্বাচন এলে তাদের কাছ থেকে ভোট নিয়ে স্থানীয় ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি হন, কিন্তু সে প্রতিনিধি আর তাদের কোন খোজ খবর নেয় না। তাদের সমস্যা কথা জানালেও তারা কোন কর্ণপাত করে না। নারায়ন রবি দাসের মা পুতুল রাণী রবি দাস জানান, কয়েকটি ছাগল পালন করি, ছাগলের দুধ ও ছাগল বিক্রি করে যে আয় হয় তা দিয়ে ছেলের সংসারে সহযোগিতা করে জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছি।