চাঁদপুরে শিশু শ্রম বেড়েই চলছে ?

চাঁদপুরে শিশু শ্রম বেড়েই চলছে ॥ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূখী ব্যবস্থার অভাব
IMG0193A
মিজান লিটন ॥
দেশের সর্বত্রই শিশুরা বহুমুখী উৎপাদন প্রতিষ্ঠান, হোটেল রেস্তোরা, পরিবহন, কৃষিসহ পারিবারিক বড় ধরনের কাজ কর্মে জড়িয়ে আছে। পারিবারিক কাজের অংশ গ্রহন ছাড়া যে সব শিশু অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে, তাদের অনেকেই বিনা পারিশ্রমিকে খাটছে। কোন ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরী হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ জীবন।
আমাদের চাঁদপুরেও পিছিয়ে নেই শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে খাটানো। চাঁদপুর শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাটবাজারের হোটেল, ফার্নিচারের দোকান, চা স্টল, ওয়ার্কসপের বেশ কয়েকটি শিশুর সাথে আলাপ করে জানাগেছে, কয়েক বছর বিনা বেতনেই কাজ করেছে তারা। এক পর্যায়ে কিছু শিশু পরিবারের প্রয়োজনীয়তায় প্রতিবাদমূখী হয়ে কিছুটা পারিশ্রমিক পাচ্ছে। তবে যা পাচ্ছে তা একেবারে নূন্যতম। যে সব প্রতিষ্ঠানের মালিক শিশুদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই লক্ষ্য উদ্দেশ্য শিশুদের ঠকানো। বড়দের বেশী টাকা দিয়ে না রেখে শিশুদের কাজে নেয়। তবে এ ক্ষেত্রে মালিক, সমাজ ব্যবস্থা, শিশু শ্রম আইনের প্রয়োগ ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ এর ভূমিকায় বলা হয়েছে, শিশু জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। স্বাধীনতার পর সুখী, সমৃদ্ধ, সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বক্ষেত্রে সকল শিশুকে পূর্ণ মর্যাদাবান মানুষরূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুসহ সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সন্নিবেশিত রয়েছে।
১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child, CRC) ১৯৮৯ এ স্বাক্ষর ও অনুসমর্থনকারী প্রথম রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন করা হয়।
পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রাসঙ্গিক সকল ক্ষেত্রে শিশুর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা একান্ত আবশ্যক। শিশুর সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা ও অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি সৎ, দেশপ্রেমিক ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যতœশীল ও সক্রিয়। বাংলাদেশের ১৮ বছরের কম বয়সের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৩০ লক্ষ যা মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ।
শিশু আইনের ভূমিকায় শিশুদের প্রতি সরকার যতœশীল ও সক্রিয় বলা হলেও যে সব শিশুরা কিশোর বয়সের পূর্ব থেকেই কঠোর পরিশ্রমের কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ কোন ধরনের অভিযান কিংবা পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন! আমার মনে হয়, দায়িত্বশীল ব্যাক্তিরা দেশের দৈনন্দিন ওয়ার্ক রুটিন কাজের ভীড়ে এ বিষয়টি ভুলেই গেছেন। দেশের অভিজ্ঞ ও চিন্তাশীল ব্যাক্তিরাই এ আইন প্রণোয়ন করেছেন। যাদের চিন্তার মাঝে কোন রকমের ফাঁকি নেই। কিন্তু দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিটি নাগরিক নিজ উদ্যোগে তা বাস্তবায়ন ও এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার কথা। তাও হচ্ছে কি?
প্রতিবছর শিশু দিবস আসলে দিবসটি পালন, সভা, সেমিনার আর বড় ধরনের বক্তব্যে দিয়েই শেষ। কিন্তু সামাজিকভাবে জনপ্রতিনিধি ও সকল পেশাজীবী মানুষেরই শিশুদের ব্যাপারে যতœশীল হওয়ার কথা। দেশের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে প্রতিটি নাগরিকই অংশগ্রহন করবে। মানব সম্পদই হচ্ছে বড় সম্পদ। এ মানব সম্পদের উন্নয়নের ভিত্তিই যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আগামীতে আমরা কি ধরনের জনশক্তি আশা করতে পারি।
জাতীয় শিশু আইনের ৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: শিশুশ্রম নিরসনের পদক্ষেপসমূহ: শিশুশ্রম পর্যায়ক্রমে নিরসন করা হবে। বাস্তবতার নিরিখে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে অনেক শিশু বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত। শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ এর আলোকে নিম্নোক্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ৮.১ ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে সার্বক্ষনিক কর্মী হিসাবে নিয়োগ হতে বিরত রাখতে হবে।
৮.২ শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে দুঃস্থ ও নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থাপন্ন শিশুদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষার পাশাপাশি মাসিক মাসোহারা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে করে তারা পড়াশুনা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে। ৮.৩ শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে শিশুকে যেন কোন ধরণের অসামাজিক বা অমর্যাদাকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮.৪ কর্মস্থলে দৈনিক কর্মঘন্টা ও এর মধ্যবর্তী নির্দিষ্ট সময়ে কর্মবিরতি এবং বিনিময় মজুরী নিশ্চিত করা হবে। ৮.৫ শিক্ষা ও বিনোদন শিশুর মৌলিক অধিকার, আর তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কর্মঘন্টা অতিক্রান্ত হবার পর নিয়োগকর্তা উক্ত শিশু শ্রমিকের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে।
৮.৬ কর্মকালীন সময়ে শিশু কোন ধরণের দূর্ঘটনার সম্মুখীন হলে বা অসুস্থ অনুভব করলে মালিকপক্ষ বা নিয়োগকর্তা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। ৮.৭ গৃহকর্মে বা অন্যান্য কর্মে নিয়োজিত শিশুদের প্রতিমাসে কমপক্ষে একবার বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ৮.৮ গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা সাধারণত সার্বক্ষনিক কর্মী হিসেবে নিযুক্ত থাকে বিধায় তাদের লেখা-পড়া, থাকা-খাওয়া, আনন্দ-বিনোদন নিশ্চিত করা এবং তাকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো থেকে বিরত রাখতে হবে। ৮.৯ যে সকল প্রতিষ্ঠানে শিশুরা নিয়োজিত আছে, সেখানে শিশুরা যেন কোনরূপ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে।
৮.১০ ঝুঁকিপূর্ণ ও নিকৃষ্ট ধরনের শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রত্যাহার করতে হবে। ৮.১১ শ্রমজীবী শিশুদের দারিদ্র্যের চক্র হতে বের করে আনার লক্ষ্যে তাদের পিতামাতাদের আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ডে স¤পৃক্ত করতে হবে। ৮.১২ শ্রমজীবী শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার জন্য বৃত্তি ও আনুতোষিক প্রদান করতে হবে। ৮.১৩ শিশুশ্রমে ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পিতামাতা, সাধারণ জনগণ ও সুশীল সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ৮.১৪ বাংলাদেশ হতে ২০১৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
একজন শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, শিশু শ্রমের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। শিশুদের জন্য শিশু আইনে নাগরিকের সকল সুযোগ সুবিধা সংরক্ষনের কথা বলা হলেও অনেকাংশে অভাব রয়েছে। স্বাধীনতার পর শিশুদের জন্য দেশে আজ পর্যন্ত সরাসরি কোন দৈনিক পত্রিকা বের হয়নি। তবে মাসিক কিংবা ম্যাগাজিন আকারে বের হয়।
শিশু শ্রম আইনের উল্লেখিত অনুচ্ছেদে শিশুদের নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষনের যে অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, তাতে একজন শিশু শ্রম দিয়েও পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যৎ জীবন গড়া সম্ভব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সাথে আমাদের দেশ এখন অনেকটা এগিয়ে। এ প্রতিযোগিতার ধারবাহিকতায় টিকে থাকতে হলে, অবহেলিত ও বঞ্চিত শিশুদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে সকলকে এবং তাদেরকে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত নাগরিক হিসেবে তৈরী করার জন্য কাজ করতে হবে। তাহলেই বিশ্বের দরবারের মাথা উচুঁ করে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।