আ. লীগের পুঁজি উন্নয়ন বিএনপির ভরসা ঐক্য

চাঁদপুর-২ আসনের ভোটের রাজনীতিতে শক্তির বিবেচনায় এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া পর পর দুই মেয়াদে দলের সংসদ সদস্য থাকায় এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ছিল ধারাবাহিকতা। আগামী সংসদ নির্বাচনে সেটাকেই পুঁজি হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন দলটি। তবে দলের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সংসদ সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন দলের আরেক নেতা নুরুল আমিন রুহুল। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

অন্যদিকে বিএনপির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য মো. নুরুল হুদার মৃত্যুর পর এ আসনে দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে বিকল্প প্রার্থীও তৈরি হয়েছে ধানের শীষ প্রতীকের। তিনি হলেন ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। দলের নেতাকর্মীরা ভরসা করছে দলের ঐক্যকে।

মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলা নিয়ে চাঁদপুর-২ সংসদীয় আসন। বিগত দশটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে চারবার। বিএনপি তিনবার ও জাতীয় পার্টি দুইবার এ আসনে বিজয়ী হয়েছে। একবার আসনটি পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এর আগে ২০০৮ সালে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বিএনপির মো. নুরুল হুদাকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন।

একসময় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।

তাঁর পৈতৃক বাড়ি মতলব উত্তরের মোহনপুর এলাকায়। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। কিন্তু তিনি বিএনপির প্রার্থী মো. নুরুল হুদার কাছে হেরে যান। অবশ্য ’৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মায়া। তখন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পান তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে মায়াকে হারিয়ে দেন মো. নুরুল হুদা। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মায়া দেশের বাইরে থাকায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মো. রফিকুল ইসলাম।

আওয়ামী লীগ : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন সমাবেশের নামে প্রতি সপ্তাহে জনসংযোগ করছেন তিনি। অন্যদিকে, একই দলের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সহসভাপতি নুরুল আমিন রুহুল সতীর্থদের নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মতলব উত্তর উপজেলা শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ কুদ্দুস বলেন, ‘১৯৯৬ সালের পর থেকে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নকাজ করেছেন মায়া চৌধুরী। মতলব উত্তর উপজেলা এবং ছেঙ্গারচর ও মতলব নামে দুটি পৌরসভা করেছেন তিনি। সুতরাং আগামী সংসদ নির্বাচনেও নৌকা প্রতীক নিয়ে মায়া চৌধুরী আবারও নির্বাচিত হয়ে এলাকাবাসীর পাশে দাঁড়াবেন।’

মতলব দক্ষিণ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এ এইচ এম গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘চাঁদপুর-২ আসনে মায়া চৌধুরীর কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র তিনিই দুই মতলবের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পেরেছেন। বৃহত্তর মতলবে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ধনাগোদা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের। তাও বাস্তবায়ন করেছেন মায়া চৌধুরী।’

মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া তাঁর নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন সমাবেশ করে প্রতিনিয়ত নৌকা প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করছেন। এসব সমাবেশে তাঁর সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন ছেলে সাজেদুল হোসেন চৌধুরী দিপু। সমাবেশগুলোতে মায়া চৌধুরীর বক্তব্য একটাই—আগামী নির্বাচনে এলাকার উন্নয়নের কারণে নৌকার জয় সুনিশ্চিত।

একই দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা আওয়ামী লীগের নেতা নুরুল আমিন রুহুল। বিগত ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূলের ভোটে এগিয়ে ছিলেন তিনি। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নুরুল আমিন রুহুল বৃহত্তর মতলবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার পেছনে অনেক অবদান রেখেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা মহসিন মিয়া মানিক। তিনি বলেন, ‘রুহুল ভাইয়ের পেছনে এখনো তৃণমূলের অসংখ্য নেতাকর্মী আছে।’

ছেঙ্গারচর পৌর আওয়ামী লীগ নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সবদিক বিবেচনায় নিলে নুরুল আমিন রুহুল অবশ্যই মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন।’

ছেঙ্গারচর পৌরসভার কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা মো. জামান বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মনোনয়ন পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ, বিশেষ একটি গোষ্ঠী নিজেদের মতো করে শাসন করছে। ফলে এখানে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে না।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নুরুল আমিন রুহুল বলেন, ‘বিগত দিনে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলাম। কিন্তু কতিপয় কুচক্রী মহলের কারসাজিতে সামান্য ভোটে হেরে যাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। মায়া চৌধুরী বিএনপি-জাতীয় পার্টির লোকদের দলে ভিড়িয়ে হাইব্রিড আওয়ামী লীগে পরিণত করেছেন।’

রুহুল আশা করেন, তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে তাঁকেই মূল্যায়ন করবে।

বিএনপি : এই আসনের মতলব উত্তর উপজেলায় ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির মারপ্যাঁচে ন্যুয়ে পড়া বিএনপি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে মতলব দক্ষিণে সংগঠনটি কিছুটা চাঙ্গা। স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করছে আওয়ামী লীগ। এতে শুধু বিএনপিই নয়, সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও প্রতিপক্ষের মামলা আর হামলার ভয়ে এলাকা ছাড়া। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টায় আছে দলটি। এ আসনে বিএনপির টিকিটে তিনবার সংসদ সদস্য হয়েছেন মো. নুরুল হুদা। আর একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তিনি বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর চাঁদপুর-২ আসনে দলের হাল ধরেন তাঁরই ঘনিষ্ঠজন জালাল উদ্দিন। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় স্পেনের অনারারি কনসুলার জেনারেল ছিলেন তিনি। সফল ব্যবসায়ী ও মুদ্রা বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশ-বিদেশে সুখ্যাতি রয়েছে তাঁর। বিএনপির কেন্দ্র, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিতে আছেন জালাল উদ্দিন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে দলের জন্য কাজ করেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু তখন নির্বাচন হয়নি। পরে ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন তিনি।

তবে বিএনপি ছেড়ে যাননি জালাল—এমন কথা জানালেন মতলব উত্তর উপজেলা শাখা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক জিতু। একই কমিটির সভাপতি আহসানুল হক ফটিক বলেন, দুর্দিনে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন এবং বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়েছেন ড. জালাল। গত ৯ বছরে যেখানে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নির্যাতিত সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। এমন বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জালাল উদ্দিনের বিকল্প নেই এই আসনে।

বিএনপি মতলব দক্ষিণ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এমরান হোসেন মিলন বলেন, ‘আসনটি আমাদের ফিরিয়ে আনতে হলে যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। সেই ক্ষেত্রে নেতাকর্মীদের নিয়ে সব সময় পাশে ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের বিকল্প নেই।’ দলের একই উপজেলা শাখার সভাপতি এমদাদ হোসেন বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আমরা চাঁদপুর সদরের একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু আসন বিন্যাসের কারণে এখন মতলব উত্তরের সঙ্গে আমরা। সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত হলে এই আসনটি বিএনপির জন্য পুনরুদ্ধার সহজ হবে।’ মতলব দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাই বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এই আসনে বিএনপির পক্ষেই রায় যাবে।’

মতলব পৌরসভার সাবেক মেয়র এনামুল হক বাদল বলেন, ‘বিএনপির মাঠের রাজনীতিতে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। তাই আগামী নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে সেই ঐক্য আমরা প্রমাণ করব।’

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, ‘চাঁদপুর-২ আসনের মতলব উত্তর ও দক্ষিণের সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের দুঃশাসন থেকে মুক্তি চায়। সে জন্য তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনে আগ্রহী। এলাকার নির্যাতিত সাধারণ মানুষ এবং দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি তথা জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনীতি করছি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর থেকে সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মতলবে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী করতে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছি। তাই দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আগ্রহের কারণে আবারও আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা দাবি করছি।’

জাতীয় পার্টি : বিরোধী দল জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করার মতো এখনো কারো নাম আলোচনায় আসেনি। জাতীয় পার্টির শাসনামলে এই আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) শামছুল হক। তিনি ওই সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখানে দলটি এখন নিষ্ক্রিয় প্রায়।