আওয়ামী লীগের ভরসা উন্নয়ন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি

শুধু ফরিদগঞ্জ উপজেলা নিয়ে চাঁদপুর-৪ সংসদীয় আসন। ভোটের হিসাব বলছে, দশম সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এ এলাকায় বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। আর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়াকে পরীক্ষা দিতে হয়নি। সে কারণে আগামী নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখাই হবে আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ক্ষমতাসীন দলটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপরই ভরসা করছে। অন্যদিকে বিএনপি যদি অংশ নেয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দলটির লক্ষ্য হবে আসনটি পুনরুদ্ধার করা।

একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এখন থেকে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। দলের মনোনয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্যসহ প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের আগ্রহী প্রার্থীরা।

এ আসনের সংসদ সদস্য ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া প্রায় এক যুগ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে ছিলেন। আগামী নির্বাচনে তিনি ছাড়াও দলের মনোনয়ন চান জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ সফিকুর রহমান, প্রবীণ রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু খায়ের পাটোয়ারী, পেশাজীবী নেতা চিকিৎসক হারুন অর রশিদ সাগর ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা অ্যাডভোকেট জাহিদুল ইসলাম রোমান।

অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির মনোনয়ন চাইতে পারেন দলের সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন হারুনুর রশিদ ও কেন্দ্রীয় নেতা মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী।

উল্লেখ্য, এই সংসদীয় এলাকায় ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের এম সফিউল্লাহ। এরপর ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে আসনটি বিএনপির দখলে চলে যায়। তখন সংসদ সদস্য হন মাওলানা আব্দুল মান্নান। এরপর জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করেন। এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি আসনটি দখল করে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ আসন নিজেদের দখলে রাখে দলটি।

আওয়ামী লীগ : ফরিদগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের পাটোয়ারী ও সাধারণ সম্পাদক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাহেদ সরকারের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ বলে জানালেন দলের দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সামাদ পাটোয়ারী মিন্টু।

উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. বিল্লাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন ভবন নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণসহ আরো বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হওয়ায় সংসদ সদস্য শামছুল হক ভূঁইয়ার প্রতি দলের বাইরেও সাধারণ মানুষের আস্থা বেড়েছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান বলেন, আগামী নির্বাচনে সংসদ সদস্য শামছুল হক ভূঁইয়ার বিকল্প কেউ নেই।

আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান আজাদ বলেন, ‘মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে পুলিশ ও প্রশাসনকে সহযোগিতা দিয়েছেন আমাদের সংসদ সদস্য।’

সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাহেদ সরকার বলেন, ‘এলাকায় উন্নয়নের ধারা ধরে রাখতে হবে। এর জন্য নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে শামছুল হক ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।’

আগামী সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন চাইবেন বলে নিশ্চিত করেছেন সংসদ সদস্য শামছুল হক ভূঁইয়া। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক ও এলাকাবাসী আমার কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট আছে। কারণ শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে এই এক মেয়াদেই নয়, দীর্ঘদিন ধরে ফরিদগঞ্জে সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে আমার ভূমিকা রয়েছে। এমন অবস্থায় আগামী দিনে এ এলাকাকে দেশসেরা একটি মডেল উপজেলায় পরিণত করার প্রত্যয় রয়েছে আমার। তাই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল অবশ্যই আমাকে মূল্যায়ন করবে। ফলে ভোটের মাঠেও সবার আস্থা অর্জনে সফল হব।’

এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে আরো মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন এর আগের দুই নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী সাংবাদিক মুহাম্মদ সফিকুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের পাটোয়ারী, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), চাঁদপুর শাখার সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) ডা. হারুন অর রশিদ সাগর ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জাহিদুল ইসলাম রোমান।

আবুল খায়ের পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাত্র ও যুবলীগের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছি। তাই আমার চেতনায় শুধু বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা। এসব নিয়ে এগিয়ে চলার প্রেরণা জননেত্রী শেখ হাসিনা। সেই বিবেচনায় মনোনয়নের বিষয়টি দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত।’

ডা. হারুন অর রশিদ সাগর বলেন, ‘নিজের সামর্থ্য নিয়ে এলাকায় কয়েক হাজার দুস্থ অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছি। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত আমার আগামী দিনের পথচলার পাথেয়। তবে সবার দোয়া নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।’

জাহিদুল ইসলাম রোমান বলেন, ‘আমার বাবা অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গণপরিষদের সদস্য ছিলেন। বাবার পরিচিতি আর ঐতিহ্য নিয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।’ তবে তিনি বলেন, ‘এই মূহূর্তে মনোনয়ন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। দলের আদর্শ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো হচ্ছে মূল লক্ষ্য।’

মুহাম্মদ সফিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন কামরুল ইসলাম সাউদ বলেন, ‘আশা করছি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সফিক ভাই আবারও মনোনয়ন পাবেন।’

বিএনপি : ২০০৮ সালে সারা দেশ ও চাঁদপুরের অন্য আসনগুলোতে যখন আওয়ামী লীগের জয়জয়কার তখন বিএনপির প্রার্থী লায়ন হারুনুর রশিদ ফরিদগঞ্জ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে দলে নতুন হয়েও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বর্তমানে বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ব্যাংকিং ও রাজস্ব বিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ। রাজনীতির বাইরেও শিল্পোদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার তিনি। উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি অংশ তাঁর সঙ্গে রয়েছে।

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফ মো. ইউনুস বলেন, প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হয়ে শতাধিক মামলার আসামি শত শত নেতাকর্মী। তিনি আরো বলেন, ২০১৩ সালের শেষের দিকে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে তা সহিংস রূপ লাভ করে। এ সময় প্রতিপক্ষ ও পুলিশের হাতে ছাত্র ও যুবদলের তিনজন প্রাণ হারায়। এসব ঘটনায় উল্টো মামলার শিকার হয়ে এখনো পুলিশের হয়রানির শিকার হচ্ছে অনেকেই। এর পরও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ব্যাহত করা যাবে না।

উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, লায়ন হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী শক্তি ঐক্যবদ্ধ আছে। এটি প্রমাণিত হবে আগামী নির্বাচনে।

উপজেলা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলুর রহমান বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আমরা হারুন ভাইয়ের নেতৃত্বে এই আসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে উপহার দেব।’

সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনেও তাদের পাশে থাকার ইচ্ছা আছে। সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য, চাঁদপুর জেলা কমিটির অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন পাটোয়ারীও মনোনয়ন চাইতে পারেন। এর আগে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন লাভ করেন তিনি। কিন্তু পরে নাটকীয়ভাবে মনোনয়ন পরিবর্তন হয়। ওই সময় যিনি মনোনয়ন পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তাঁর জন্য কোমর বেঁধেই মাঠে নামেন মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী।

জানা গেছে, ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ফরিদগঞ্জে বিএনপির একমাত্র আর্থিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মোতাহার হোসেন পাটোয়ারীর বড় ভাই শিল্পপতি প্রয়াত নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী। মূলত তাঁদের হাত ধরেই ফরিদগঞ্জে বিএনপি প্রতিষ্ঠা পায়। মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী সামাজিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষা বিস্তারে মা-বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন আম্বিয়া-ইউনুস ফাউন্ডেশন। রাজনীতির বাইরে এসব কাজ করে বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছেন তিনি। তাঁর সম্পর্কে ছাত্রদলের সাবেক নেতা সিরাজুল ইসলাম পাবক বলেন, যাদের কারণে ফরিদগঞ্জে বিএনপি সমৃদ্ধ হয়েছে তাদের মধ্যে মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী একজন। তাই আগামী নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী একযোগে মাঠে থাকবে। আরেক সাবেক ছাত্রনেতা শাহ আলম মুকুল বলেন, জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য ধরে রাখার জন্য মোতাহার হোসেন পাটোয়ারীর বিকল্প নেই।

ফরিদগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘ধানের শীষ হচ্ছে এ এলাকার মানুষের প্রাণের প্রতীক। মোতাহার হোসেন পাটোয়ারীর মনোনয়ন নিশ্চিত হলে আমাদের জয় সুনিশ্চিত।’

একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমানত হোসেন গাজী বলেন, ‘শুধু ঐক্যবদ্ধ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠন যাতে এ আসন ফিরিয়ে আনতে পারে সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কখনো কিছু করতে চাই না। তবে এবার আমার মনোনয়ন নিশ্চিত হলে হাতছাড়া হওয়া আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সবাইকে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে থাকব।’ তবে দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে চান তিনি।